গারনাচোর ক্রমাবনতি: সমর্থকের অপমান থেকে জাতীয় দল বাদ, কোথায় ভুল হলো?
‘গারনাচোর অবশ্যই রোজনিয়রের সঙ্গে ক্লাব ছেড়ে যাওয়া উচিত’—গত শনিবার রাতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে চেলসির হারের পর এক সমর্থক এমন মন্তব্য করে নিজের বিরক্তি প্রকাশ করেন। এই অপমানবাক্য শুধু একটি ম্যাচের প্রতিক্রিয়া নয়, বরং আলেহান্দ্রো গারনাচোর ক্রমাগত পতনেরই প্রতিচ্ছবি। ২০২২ সালের এপ্রিলে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সিতে অভিষেকের মাধ্যমে আলোড়ন তুলেছিলেন এই আর্জেন্টাইন উইঙ্গার। শুরুতে ফুটবলীয় প্রতিভার পাশাপাশি ব্যক্তিগত পছন্দ নিয়েও আলোচনায় এসেছিলেন তিনি, কারণ তাঁর প্রিয় ফুটবলার ছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি নন।
শুরুর প্রতিশ্রুতি ও বর্তমান বাস্তবতা
গারনাচোর মধ্যে অনেকে তরুণ রোনালদোর ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি পল স্কোলস তাঁকে ‘শিল্পী’ বলে অভিহিত করেছিলেন। প্রতিভার জোরে ২০২২ বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনাও জাগিয়েছিলেন তিনি, যদিও শেষ পর্যন্ত স্কালোনির দলে জায়গা পাননি। তবে আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ তারকাদের একজন হিসেবে দেখা হচ্ছিল তাঁকে। কিন্তু ক্যারিয়ারের গতিপথটা যেভাবে এগোনোর কথা ছিল, সেভাবে এগোয়নি। ২০২২ বিশ্বকাপে অভিজ্ঞতার অভাবে খেলতে না পারা গারনাচো এবার পারফরম্যান্সের কারণে বাদ পড়ার শঙ্কায় আছেন।
চলতি মৌসুমে চেলসিতে তাঁর পারফরম্যান্স উদ্বেগজনক। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৯ ম্যাচে মাত্র ৮ গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। প্রিমিয়ার লিগে ২২ ম্যাচে তাঁর রেকর্ড আরও খারাপ—মাত্র ১ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট। এই বাজে পারফরম্যান্স চেলসির সামগ্রিক ফলেও প্রভাব ফেলেছে। নিজের সাবেক ক্লাব ইউনাইটেডের বিপক্ষেও সুবিধা করতে না পারায় তাঁকে বদলি হয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে। গতকাল ওল্ড ট্রাফোর্ডে ইউনাইটেডের খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁর কোনো কথোপকথন না হওয়ায় আরেকটি অপমানজনক দৃশ্য সামনে এসেছে।
সমর্থক ও সতীর্থদের প্রতিক্রিয়া
ইউনাইটেডের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার লুক শ ইনস্টাগ্রামে একটি ছবি পোস্ট করেন, যেখানে গারনাচোকে মাটিতে ফেলে দিতে দেখা যায়। ছবির ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ জয়’। এই পোস্টে ইউনাইটেড সমর্থকদের পাশাপাশি সতীর্থরাও মন্তব্য করেন। স্টিভেন বার্টলেট লিখেছেন, ‘আহাহাহাহ’, অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেজ জিআইএফ শেয়ার করেন ‘এটা তো একেবারে অপমান!’ লেখা নিয়ে, আর সাবেক সতীর্থ অ্যালেক্স টেলেস দুটি আগুনের ইমোজি ও একটি ভালোবাসার চিহ্ন দেন।
ক্লাব ছাড়ার অনুশোচনা ও ভুল সিদ্ধান্ত
প্রিমিয়ার লিগ প্রোডাকশনসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইউনাইটেড ছাড়ার বিষয়ে গারনাচো খোলামেলা কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘হয়তো কিছুটা অনুশোচনা আছে। কারণ, আমি ক্লাবটিকে ভালোবাসতাম। শুরু থেকেই তারা আমার ওপর আস্থা রেখেছে—স্পেন থেকে আমাকে একাডেমিতে নিয়ে এসেছে, পরে প্রথম দলে সুযোগ দিয়েছে। চার-পাঁচ বছর সেখানে কাটিয়েছি, সবার কাছ থেকে দারুণ ভালোবাসা পেয়েছি। তবে জীবনের ভালোর জন্য কিংবা পরবর্তী ধাপে যাওয়ার জন্য কখনো কখনো পরিবর্তন দরকার হয়। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে নিয়ে আমার শুধু ভালো স্মৃতিই আছে।’
আমোরিমের অধীনে শুরুটা কঠিন হলেও পরে দলে জায়গা ফিরে পেতে গারনাচোর পরিশ্রমের প্রশংসা করেছিলেন এই কোচ। যদিও তাঁর ছকে গারনাচোর জন্য স্বাভাবিক কোনো পজিশন ছিল না—প্রকৃতপক্ষে উইঙ্গার হলেও তাঁকে খেলানো হয় ‘নম্বর ১০’ ভূমিকায়। পরিস্থিতি আবার খারাপের দিকে যায় এবং দলের পরিকল্পনা থেকে ছিটকে পড়েন গারনাচো। তিনি স্বীকার করেছেন, দলের বাইরে থাকার সময় কিছু ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ নিয়েছিলেন, যা ক্লাব ছাড়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
জাতীয় দল নিয়ে অনিশ্চয়তা
আর্জেন্টিনা দলকে বেছে নেওয়ার বিষয়ে গারনাচো বলেন, ‘এর কারণ হলো, তারা শুরু থেকেই আমার ওপর আস্থা রেখেছে—ভবিষ্যতে আমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখব বলে বিশ্বাস করেছে। এখানে লিওনেল মেসিও বড় একটা ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর সঙ্গে খেলার সুযোগ—এটা এমন কিছু, যেটা সহজে না বলা যায় না। আমি জানি, আমি তাঁদের জন্য বড় কিছু করব—এটা শুধু সময়ের ব্যাপার।’
তবে দূর ভবিষ্যতে আর্জেন্টিনা দলের জন্য কী করবেন, এখনই বলার সুযোগ নেই। ২০২৪ সালের নভেম্বরের পর আকাশি-সাদা জার্সিতে আর খেলা হয়নি তাঁর। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, লিওনেল স্কালোনির সম্ভাব্য বিশ্বকাপ দলে গারনাচোর নাম নেই বলে শোনা যাচ্ছে। এই তথ্য যদি সত্যি হয়, তবে ক্লাবের পাশাপাশি জাতীয় দল বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েও কি আফসোস করবেন এই তরুণ উইঙ্গার? উত্তরটা সময়ের হাতেই তোলা রইল।



