ইসমাইল হোসেনের সাফল্যের পেছনের গল্প: টাইব্রেকার থেকে বিকেএসপির ভিত্তি
বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবল দলের গোলকিপার ইসমাইল হোসেন সম্প্রতি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে টাইব্রেকারে প্রথম শটটি ঠেকিয়ে দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি মাত্র ৪ ম্যাচে ১ গোল হজম করেছেন, যা তার অসাধারণ পারফরম্যান্সের প্রমাণ।
টাইব্রেকারের মুহূর্ত ও আত্মবিশ্বাস
ইসমাইল হোসেন বলেন, "আত্মবিশ্বাস ছিল যে পারব। টাইব্রেকারের শুরু থেকেই মনকে এটাই বলেছি, দলকে জেতাতে হবে। যেভাবেই হোক শট রুখতে হবে। আমি ডান দিকে ঝাঁপিয়েছি এবং নিচু হয়ে আসা বলটা পেয়ে গেছি নাগালে।" ভারতের প্রথম শট ফেরানোর পর দল উজ্জীবিত হয়েছিল, এবং এটি তার জন্য একটি বিশেষ মুহূর্ত ছিল। তিনি ফাইনালে কোনো চাপ নেননি, বরং স্বাভাবিকভাবে খেলেছেন এবং আল্লাহ ও বাবা-মায়ের দোয়ায় জয়লাভ করেছেন বলে উল্লেখ করেন।
সাফল্যের রহস্য: দলীয় বন্ধন ও অনুশীলন
ইসমাইল হোসেনের মতে, এই সাফল্যের মূল রহস্য হলো দলের শক্তিশালী বন্ধন। তিনি বলেন, "আলহামদুলিল্লাহ, আমরা দল হিসেবে খুব ভালো খেলেছি। আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল টিম বন্ডিং। অনেক দিন একসঙ্গে ক্যাম্প করেছি, একসঙ্গে অনুশীলন করেছি। এই বোঝাপড়াই মাঠে কাজে দিয়েছে।" ফাইনালের আগে দলীয় ছবি তোলা এবং একত্রে সময় কাটানো তাদের মনোবল বৃদ্ধি করেছিল।
গোলকিপার হিসেবে শক্তি ও বিকেএসপির ভূমিকা
ইসমাইল হোসেন গোলকিপার হিসেবে তার শক্তির জায়গা সম্পর্কে বলেন, "সব সময় চেষ্টা করি ভুল কম করতে এবং নিজের সেরাটা দিতে। আমার উচ্চতা ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি, যা একটি বাড়তি পাওনা।" তার ফুটবল ভিত্তি গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) থেকে, যেখানে তিনি বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। ২০১৯ সালে ট্রায়াল দিয়ে তিনি বিকেএসপিতে ভর্তি হন এবং এই প্রতিষ্ঠান তাকে গড়ে তুলেছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
মালদ্বীপের অভিজ্ঞতা ও লক্ষ্য
মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টের সময় দলটি শুধু খেলার উপরই মনোযোগ দিয়েছে। ইসমাইল হোসেন বলেন, "সময়টা অসাধারণ ছিল, তবে আমরা ঘুরতে যাইনি, পুরো মনোযোগ ছিল খেলায়। শৃঙ্খলা মেনে চলেছি, খাবারদাবার নিয়ন্ত্রণে রেখেছি। আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল—ট্রফি নিয়ে দেশে ফেরা।" এই লক্ষ্য পূরণ করতে পেরে দলটি গর্বিত বলে তিনি জানান।
ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরু ও পরিবার
ইসমাইল হোসেনের ফুটবল যাত্রা শুরু হয় বিকেএসপিতে, পরে তিনি বাফুফের এলিট একাডেমিতে সুযোগ পান। তিনি বলেন, "শুরুতে ফরোয়ার্ডে খেলতাম, কিন্তু একবার আন্তস্কুল ম্যাচে স্যার জোর করে গোলকিপার বানিয়ে দেন। তারপর থেকেই এই পজিশনে খেলছি।" তার বাড়ি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায়, এবং তিনি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বাবা কাতারে থাকেন, এবং শুরুতে বাবা তার খেলাধুলা পছন্দ করতেন না, কিন্তু এখন তাকে সমর্থন দেন।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও অনুপ্রেরণা
ইসমাইল হোসেনের সামনের লক্ষ্য হলো নিজেকে আরও উন্নত করা এবং বাংলাদেশ জাতীয় দলে দীর্ঘ সময় টিকে থাকা। তিনি বলেন, "আমার বয়স এখন ২০ বছর চলছে, সামনে অনেকটা সময়। চাইব নিজেকে আরও তৈরি করতে। বাংলাদেশকে বিশ্বকাপের মতো বড় জায়গায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্নও দেখি।" তিনি কুষ্টিয়া থেকে রাব্বি আহমেদের মতো খেলোয়াড়দের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।
ইসমাইল হোসেনের এই সাফল্য বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য একটি উজ্জ্বল অধ্যায়, এবং তার দৃঢ় মনোবল ও পরিশ্রম তাকে ভবিষ্যতেও সাফল্যের দিকে নিয়ে যাবে বলে আশা করা যায়।



