২০২৬ বিশ্বকাপের প্রাক্কালে আর্জেন্টিনা: মেসির উপর নির্ভরতা ও দলের নড়বড়ে অবস্থা
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়া আর্জেন্টিনার সেই জয়জয়কার এখন অনেকটাই ফিকে। লুসাইলের সেই মায়াবী রাত, যখন লিওনেল মেসির হাতে উঠেছিল বিশ্বকাপ ট্রফি, সেটা এখন শুধুই স্মৃতি। সাত ম্যাচে সাত গোল ও তিনটি অ্যাসিস্ট করে মেসি শুধু আর্জেন্টিনার অধিনায়কই ছিলেন না, ছিলেন দলের হৃৎস্পন্দন। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের সামনে এসে আর্জেন্টিনা কোথায় দাঁড়িয়ে?
বাছাইপর্বের সাফল্য ও লুকানো দুর্বলতা
কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনার বাছাইপর্ব চমৎকার। কনমেবল টেবিলে শীর্ষে থেকে তারা বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছে, মেসি ৮ গোল করে প্রথমবারের মতো বাছাইপর্বের শীর্ষ গোলদাতা হয়েছেন। কিন্তু সংখ্যাগুলো একটা কথা বলে না—বাকি দলগুলো কতটা দুর্বল ছিল। উরুগুয়ে ও ব্রাজিলের মতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীরা চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে শেষ করেছে। উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ের কাছে হার, কলম্বিয়ার সঙ্গে ঘরের মাঠে ড্র—এই বিব্রতকর ফলগুলো স্কালোনির জন্য সতর্কসংকেত ছিল।
প্রীতি ম্যাচে নিষ্প্রাণ পারফরম্যান্স
বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে আর্জেন্টিনা মৌরিতানিয়া ও জাম্বিয়ার মতো দুর্বল দলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলেছে। মৌরিতানিয়ার বিপক্ষে ২-১ জয়টাও এসেছে প্রায় কদর্যভাবে। কোচ স্কালোনি নিজেই মেনে নিয়েছেন, ‘ম্যাচটা আমরা ভালো খেলিনি এবং এটাই বাস্তব।’ গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ আরও সরাসরি বলেছেন, ‘এটা আমাদের খেলা সবচেয়ে খারাপ প্রীতি ম্যাচগুলোর একটা।’
ফিনালিসিমা না হওয়ায় ক্ষতি
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে ফিনালিসিমা বাতিল হয়ে গেছে। নিকোলাস তালিয়াফিগো আক্ষেপ করেছেন, ‘ট্রফি জয় ছাড়াও এটা গুরুত্বপূর্ণ হতো, কারণ আপনি এমন একটা দলের মুখোমুখি হতেন, যারা বিশ্বকাপ জেতার ক্ষমতা রাখে।’ ২০২২ সালের ফিনালিসিমায় ইতালিকে গুঁড়িয়ে দিয়ে আর্জেন্টিনা কাতারে গিয়েছিল আত্মবিশ্বাসের পাহাড় নিয়ে, এবার মৌরিতানিয়া-জাম্বিয়াই ভরসা।
মেসির উপর অত্যধিক নির্ভরতা
মেসি আদৌ বিশ্বকাপে খেলবেন কি না, সেটা নিজেই ধোঁয়াশার মধ্যে রেখেছেন। স্কালোনি স্পষ্ট, ‘আমি সব করব যাতে সে থাকে। ফুটবলের স্বার্থেই তাকে থাকতে হবে। কিন্তু সিদ্ধান্তটা তার।’ ৩৭ বছর বয়সে মেসি এখনো ম্যাচ জেতাতে পারেন, কিন্তু ২০২২-এর সেই সর্বত্র বিরাজমান মেসি আর নেই। প্রতি পাঁচ-ছয় দিনে পুরো ৯০ মিনিট খেলা—সাঁইত্রিশ বছরের শরীর কতটুকু নেবে?
দলের অন্যান্য সমস্যা
মেসি না খেললে আর্জেন্টিনার অবস্থা আরও শোচনীয় হতে পারে। আনহেল দি মারিয়া অবসরে গেছেন, তাঁর শূন্যস্থান পূরণে নিকো গঞ্জালেস চেষ্টা করছেন। রদ্রিগো দি পলের গতি কমেছে, এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার অধারাবাহিক। রক্ষণে বার্ধক্য বড় সমস্যা—৩৮ বছর বয়সী নিকোলাস ওতামেন্দি, ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর বিপর্যয়কর মৌসুম, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও গনসালো মন্তিয়েলের ইনজুরি।
আশার কিছু আলো
তবু কিছু আশার আলোও আছে। হুলিয়ান আলভারেজ আতলেতিকো মাদ্রিদের হয়ে সঠিক সময়ে ফর্মে এসেছেন, লাওতারো মার্তিনেজ ইন্টার মিলানে দুর্দান্ত মৌসুম কাটাচ্ছেন। রিয়াল মাদ্রিদের তরুণ ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়ানো ও কোমোর নিকো পাজ চমক দেখাতে পারেন। কিন্তু ২১ বছরের পাজের মাত্র সাত আন্তর্জাতিক ম্যাচের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিশ্বকাপের চাপ নেওয়া সহজ নয়।
উপসংহার
২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার দরকার ছিল ছন্দ ফিরিয়ে আনার সময়, সেটা নেই এখন। স্পেন ও ফ্রান্স নিশ্চিতভাবেই আর্জেন্টিনার চেয়ে অনেক এগিয়ে। প্রতিটি পজিশনে তাদের গভীরতা আর্জেন্টিনার চেয়ে ঢের বেশি। এখন এই নড়বড়ে তরি নিয়ে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া মানে অলৌকিক কিছুর আশায় থাকা। মেসির পায়ে কি এখনো সেই অলৌকিকতা অবশিষ্ট আছে? উত্তর আমেরিকার গরমে তারা মানিয়ে নেবে ভালোই, কিন্তু সেই ভয় ধরানো উপস্থিতি থাকবে না হয়তো।



