বাতিগোলের জীবনের অজানা অধ্যায়: চিকিৎসক হতে চেয়েছিলেন, পা কাটতে চেয়েছিলেন
ফুটবল বিশ্বে গ্যাব্রিয়েল ওমার বাতিস্তুতা, যিনি ‘বাতিগোল’ নামে পরিচিত, তাঁর নাম শুনলেই নব্বই দশকের রোমান্টিকদের চোখে ভেসে ওঠে দীর্ঘ সোনালি চুলের এক স্ট্রাইকারের ছবি। আর্জেন্টিনার হয়ে ৭৮ ম্যাচে ৫৬ গোল করে দীর্ঘদিন দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন তিনি, যার রেকর্ড পরে লিওনেল মেসি ভেঙেছেন। সম্প্রতি রিও ফার্ডিনান্ডের পডকাস্টে হাজির হয়ে বাতিস্তুতা ফুটবল নয়, চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন, ম্যারাডোনার মৃত্যু, আর নিজের পা কাটতে চাওয়ার মতো মর্মস্পর্শী গল্প শোনালেন।
চিকিৎসক হতে চেয়েছিলেন, ফুটবল নয়
ছোটবেলায় বাতিস্তুতার লক্ষ্য ছিল চিকিৎসক হওয়া। ফুটবল তখন তাঁর জীবনের অংশই ছিল না। তিনি বাস্কেটবল, টেনিস, হ্যান্ডবল, জিমন্যাস্টিকস, এমনকি ব্যালে নাচও শিখেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এগুলো আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। বাস্কেটবল লাফাতে শিখিয়েছে, টেনিস দ্রুত নড়াচড়া করতে শিখিয়েছে।’ কিন্তু পরিবারের আর্থিক অনটনে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যায়। পড়াশোনার খরচ জোগাতে তিনি রোজারিওতে চলে যান, যেখানে মার্সেলো বিয়েলসার সঙ্গে দেখা হয়, যিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোচ হয়ে ওঠেন।
ফ্লোরেন্সে সংগ্রাম ও সাফল্য
১৯৯১ সালে আর্জেন্টিনা ছেড়ে ইতালির ফিওরেন্তিনায় যোগ দেন বাতিস্তুতা। শুরুটা কঠিন ছিল, ফ্লোরেন্সও তাঁকে প্রথমে পছন্দ করেনি। কিন্তু আর্থিক সমস্যার সমাধান হিসেবে তিনি কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন। ধীরে ধীরে গোল আসতে থাকে, এবং তিনি ফ্লোরেন্সের দর্শকদের হৃদয় জয় করেন। সেখানে ১০ বছর থেকে সিরি ‘বি’ জিতিয়ে দলকে শীর্ষ লিগে তুলেন, ইতালিয়ান কাপ ও সুপার কাপ জিতেন।
নব্বইয়ের সিরি ‘আ’-এর চ্যালেঞ্জ
নব্বইয়ের দশকের সিরি ‘আ’ ছিল রক্ষণ-কৌশলের বিশ্ববিদ্যালয়। পাওলো মালদিনি, ফ্রাঙ্কো বারেসির মতো ডিফেন্ডারদের পাশ কাটিয়ে গোল করা প্রায় অসাধ্য ছিল। বাতিস্তুতা বলেন, ‘ভয়াবহ সময় ছিল। প্রতি ম্যাচে হয়তো একটি বা দুটি সুযোগ পাওয়া যেত, সারা সপ্তাহ সেই একটি সুযোগের জন্য প্রস্তুতি নিতে হতো।’
১৯৯৮ বিশ্বকাপ ও ম্যারাডোনার স্মৃতি
১৯৯৮ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের দিন সকালে তাঁর তৃতীয় ছেলের জন্ম হয়, তবু তিনি মাঠে নামেন। বাতিস্তুতা স্মরণ করেন, ‘সিমিওনে সব সময় জেতার জন্য পাগল থাকত, আর মাইকেল ওয়েনের দ্রুতগতি অবিশ্বাস্য ছিল।’ ম্যারাডোনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বলেন, ‘তিনি নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা গেছেন, আমরা তাঁকে রক্ষা করতে পারিনি, এ জন্য আমি নিজেকেও দোষারোপ করি।’
মেসি বনাম ম্যারাডোনা: বাতিস্তুতার রায়
মেসি ও ম্যারাডোনার তুলনা প্রসঙ্গে বাতিস্তুতা বলেন, ‘তারা দুজন আলাদা। মেসি হাজার গোল করেছেন, শান্ত স্বভাবের, ২০ বছর ধরে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। কিন্তু ম্যারাডোনা ছিলেন অন্য মাত্রার, তাঁর ক্যারিশমা ও জাদু ফুটবলে অতুলনীয়। মেসিকে ম্যারাডোনার সমকক্ষ হতে বিশ্বকাপ জিততেই হতো এমন নয়, কারণ মেসি যা করেছেন তা অতুলনীয়।’
গোল করার দর্শন ও সেরা স্ট্রাইকার
বাতিস্তুতার মতে, গোল করা শেখানো যায় না, এটি টাইমিং ও অনুভবের বিষয়। তাঁর দেখা সেরা স্ট্রাইকার রোনালদো—দ্য ফেনোমেনন। বর্তমান সময়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হলান্ড তাঁকে মুগ্ধ করেন, বিশেষ করে হলান্ডের সঠিক জায়গায় থাকার ক্ষমতা। তরুণদের প্রতি তাঁর পরামর্শ, ‘অনুশীলন এমনভাবে করো যেন সেটি আসল ম্যাচ।’
যন্ত্রণায় পা কাটতে চেয়েছিলেন
খেলোয়াড়ি জীবনে ব্যথানাশক ইনজেকশন নিয়ে খেলার ফলে তাঁর গোড়ালির কার্টিলেজ ও টেন্ডন ক্ষয়ে যায়। অবসরের পর যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তিনি একসময় চিকিৎসককে পা কেটে ফেলতে বলেন। তিনি বলেন, ‘ফুটবল আমাকে অনেক দিয়েছে, কিন্তু কেড়েও নিয়েছে অনেক। তবু এর জন্য আমি ফুটবলকে নয়, নিজেকেই দায়ী করি।’ শেষ পর্যন্ত আর্থ্রোডেসিস পদ্ধতি ও কৃত্রিম গোড়ালি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে তিনি সুস্থ হন, এখন নিয়মিত গলফ খেলেন।
স্বপ্নের দল ও শেষ কথা
পডকাস্টের শেষে রিও ফার্ডিনান্ডের অনুরোধে বাতিস্তুতা তাঁর স্বপ্নের ফাইভ-এ-সাইড দল গড়েন: ডিয়েগো ম্যারাডোনা, ক্লদিও ক্যানিজিয়া, ফের্নান্দো রেদন্দো, ফ্রান্সেসকো টট্টি ও কাফু। বাতিগোলের জীবনকাহিনি ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক অনবদ্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।



