বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব কেনা থেকে সরে আসল বিটিভি, তদন্তের সিদ্ধান্ত
বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব কেনা থেকে সরে আসল বিটিভি

বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব কেনা থেকে সরে আসল বিটিভি, তদন্তের সিদ্ধান্ত

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের সরাসরি সম্প্রচার স্বত্ব কেনা থেকে পিছিয়ে এসেছে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রীয় এই সম্প্রচার সংস্থা এবার স্বত্ব ক্রয়ে অনাগ্রহ দেখিয়েছে। পাশাপাশি, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব কেনার পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। রোববার এক সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির অভিযোগ

বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবলের সম্প্রচার স্বত্বকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফিফা প্রথমে আঞ্চলিক সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের কাছে স্বত্ব বিক্রি করে, যা পরবর্তীতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর টেলিভিশন চ্যানেলের কাছে পুনর্বিক্রয় করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি বলয় গড়ে উঠেছে, যারা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে স্বল্পমূল্যে স্বত্ব কিনে বিটিভির কাছে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করে। ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে শতকোটি টাকা ব্যয় করতে হয়, কিন্তু অতিরিক্ত অর্থের হিসাব অস্পষ্ট থেকে যায়।

তমা গ্রুপ ও প্রশাসনিক জটিলতা

২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সময় এই বিতর্কে সবচেয়ে আলোচিত নাম ছিল তমা গ্রুপ, একটি নির্মাণ কোম্পানি যা হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক সম্প্রচার ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। ওই সময় এই গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, যা স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে। অভিযোগ রয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ২৮ কোটি টাকার কম মূল্যের স্বত্ব বিটিভিকে শতকোটি টাকায় বিক্রি করা হয়েছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সম্পৃক্ততা

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এই সিন্ডিকেটে সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, বাফুফের সাবেক সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন, সাবেক এক প্রভাবশালী সচিবের ছেলে, বাফুফের সদস্য গোলাম গাউস এবং বর্তমান বাফুফের একজন সহসভাপতির নাম জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমর্থন ছাড়া এত বড় অঙ্কের লেনদেন সম্ভব ছিল না। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউই এসব অভিযোগের ব্যাপারে মন্তব্য করেননি, এবং বিটিভি কখনোই স্বত্বের ক্রয়মূল্য প্রকাশ করে নি।

বিজ্ঞাপন বাজার ও সিন্ডিকেটের দ্বন্দ্ব

বিশ্বকাপের সময় টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের বাজার বিপুলভাবে প্রসারিত হয়, যেখানে একটি জনপ্রিয় ম্যাচের ৩০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন সাধারণ সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ দামে বিক্রি হয়। ফাইনাল ম্যাচের সময় একটি স্লটের মূল্য কয়েক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়, এবং বিশ্বকাপজুড়ে একটি বড় চ্যানেল কয়েকশ কোটি টাকা আয় করতে পারে। এই লাভজনক ব্যবসার কারণে সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল, বিশেষ করে কাজী সালাউদ্দিনের সঙ্গে কয়েকজনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে ফাটলের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

নতুন বিশ্বকাপ ও বিটিভির সতর্কতা

২০২৬ বিশ্বকাপের প্রাক্কালে একই ধরনের একটি গোষ্ঠী বিটিভির কাছে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বিনিময়ে সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু ২০২২ সালের অভিজ্ঞতার পর এবার বিটিভি সহজে রাজি হয়নি, এবং সংস্থার ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে যে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বল্পমূল্যে পাওয়া যাওয়া স্বত্বের জন্য এত বেশি টাকা ব্যয় করার প্রয়োজনীয়তা কী। মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন স্পষ্ট করেছেন যে দর্শকরা যাতে খেলা দেখতে পারেন, তার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কিন্তু স্বত্ব কেনা হবে না।

তদন্ত ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব কেনার প্রক্রিয়া তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রকৃত মূল্য, বিটিভির ব্যয়, স্বত্ব আনার প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা পরীক্ষা করা হবে। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, এই তদন্ত সফল হলে দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেটের চেহারা উন্মোচিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন যে বাংলাদেশের জন্য একটি স্বচ্ছ নীতিমালা তৈরি করা জরুরি, যাতে বিটিভি সরাসরি আন্তর্জাতিক সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান থেকে স্বত্ব কিনতে পারে, যা খরচ কমাবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা হ্রাস করবে।

বিশ্বকাপ ফুটবল বাংলাদেশের মানুষের কাছে কেবল একটি খেলা নয়, এটি আবেগ ও সামাজিক উৎসবের প্রতীক। এই আবেগকে পুঁজি করে একটি সিন্ডিকেট যদি রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাট চালিয়ে যায়, তবে তা ক্রীড়া প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জন্য লজ্জার বিষয়। এখন দেখার বিষয়, তদন্তের মাধ্যমে এই অদৃশ্য বলয় ভাঙা সম্ভব হবে কিনা, নাকি পুরোনো সিন্ডিকেট আবারও সক্রিয় হয়ে উঠবে।