ইরানের বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক: ফিফা মেক্সিকো স্থানান্তর প্রস্তাব নাকচ করেছে
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পরিস্থিতিতে ইরান ফুটবল দলের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকে এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
ট্রাম্পের বক্তব্য ও ইরানের প্রতিক্রিয়া
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিবৃতিতে জানান, ইরান বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারলেও নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের খেলা উপযুক্ত নাও হতে পারে। এর জবাবে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ গত পরশু ঘোষণা করেন যে, তারা ফিফার সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন যাতে ইরানের বিশ্বকাপ ম্যাচগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে মেক্সিকোয় আয়োজন করা হয়।
মেহদি তাজ স্পষ্টভাবে বলেছেন, 'ট্রাম্প যখন নিজেই স্বীকার করছেন যে তিনি আমাদের জাতীয় দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছেন না, তখন আমরা অবশ্যই আমেরিকা সফরে যাব না।'
ফিফার সিদ্ধান্ত ও যুক্তি
কিন্তু ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিফা ইরানের ম্যাচ মেক্সিকোয় সরানোর এই প্রস্তাব বিবেচনা করবে না। সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, এই প্রস্তাব নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি এবং এটি কার্যকরযোগ্য নয়। এর প্রধান কারণ হলো, ইতিমধ্যে ভেন্যুগুলোর জন্য টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে এবং এই পরিবর্তন অন্যান্য অংশগ্রহণকারী দলের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
আগামী ১১ জুন শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা। ইরান 'জি' গ্রুপে অবস্থান করছে, যেখানে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হলো বেলজিয়াম, মিসর ও নিউজিল্যান্ড। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী:
- ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলসে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হবে ইরান
- ২১ জুন লস অ্যাঞ্জেলসে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে খেলবে তারা
- ২৬ জুন সিয়াটলে মিসরের সঙ্গে ম্যাচ রয়েছে তাদের
উল্লেখ্য, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই নিজ নিজ গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে, তাহলে ৩ জুলাই ডালাসে নকআউট ম্যাচে তাদের মুখোমুখি হতে হবে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ অবস্থান
ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী আহমাদ দানিয়ামালি সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, 'যে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার আমাদের নেতাকে হত্যা করেছে, কোনো পরিস্থিতিতেই তাদের দেশে আমরা বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারি না।' এই মন্তব্য ইরানের সম্ভাব্য বর্জনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অন্যদিকে, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ১১ মার্চ জানিয়েছিলেন যে, ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে তিনি আশ্বাস পেয়েছেন ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। কিন্তু ইনফান্তিনোর এই প্রতিশ্রুতির মাত্র দুই দিন পর ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে বলেছেন, ইরান দলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে থাকা নিরাপদ নাও হতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ইরান জাতীয় ফুটবল দলের অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, 'নিশ্চিতভাবে কেউ ইরান জাতীয় দলকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিতে পারবে না। বরং বাদ পড়তে পারে সেই দেশ, যারা শুধু 'আয়োজক' নামটি বহন করে, কিন্তু এই বৈশ্বিক আসরে অংশ নেওয়া দলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নেই।'
এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) সাধারণ সম্পাদক উইন্ডসর জন দাবি করেছেন, ইরান বিশ্বকাপে খেলবে বলেই তারা এখন পর্যন্ত জানেন। তবে ইরান যদি বিশ্বকাপে না খেলে, তাদের জায়গায় কারা খেলবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র ক্ষমতা ফিফার হাতে রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং বিশ্বকাপ শুরুর আগে এর সমাধান খুঁজে পাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক ফুটবল সম্প্রদায় সতর্কতার সঙ্গে এই সংকট পর্যবেক্ষণ করছে।
