ভিভিএস লক্ষ্মণের ২৮১ রান: ইডেন গার্ডেনে লেখা ক্রিকেট ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষর
২০০১ সালের ১৪ মার্চ। কলকাতার ইডেন গার্ডেনে ভারত-অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে চলছে ঐতিহাসিক টেস্ট ম্যাচের চতুর্থ দিন। প্রথম ইনিংসে ২৭৪ রানে পিছিয়ে পড়া ভারত দ্বিতীয় ইনিংসে ফলো অনের মুখোমুখি হয়েছিল। চতুর্থ উইকেট পড়ে মাত্র ২৩২ রানে। সেই সংকটময় মুহূর্তে মাঠে নামেন ভাঙিপুরাপ্পু ভেঙ্কট সাই লক্ষ্মণ, যিনি পরিচিত ভিভিএস লক্ষ্মণ নামে।
অসম্ভবকে সম্ভব করার যাত্রা
লক্ষ্মণ ও রাহুল দ্রাবিড়ের মধ্যে গড়ে উঠেছিল সেই কালজয়ী জুটি, যা ক্রিকেট ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। পুরো দিন ব্যাট করে তারা ম্যাচের গতিপথ সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছিলেন। লক্ষ্মণ খেলেছিলেন অপরাজিত ২৭৫ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস, যদিও পরের দিন ২৮১ রানে আউট হন। এই জুটিতে তারা সংগ্রহ করেছিলেন ৩৭৬ রান, যা ভারতকে অকল্পনীয় জয়ের দিকে নিয়ে যায়।
রেকর্ড ভাঙার মহোৎসব
লক্ষ্মণের এই ইনিংসে ভেঙে পড়েছিল একের পর এক রেকর্ড:
- সুনীল গাভাস্কারের ভারতের পক্ষে সর্বোচ্চ ২৩৬ রানের টেস্ট রেকর্ড
- রোহান কানহাইয়ের ইডেন গার্ডেনে ২৫৬ রানের রেকর্ড
- ভারতের মাটিতে কোনো বিদেশি ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ স্কোর
লক্ষ্মণ স্বীকার করেছিলেন, "সুনীল গাভাস্কারের মতো কিংবদন্তির রেকর্ড ভাঙতে পারাটা বিরাট সম্মানের। আমি বেশি রোমাঞ্চিত বোধ করছি।"
সম্মান ও পুরস্কার
ডাবল সেঞ্চুরি করার পরই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গলের প্রেসিডেন্ট জগমোহন ডালমিয়া লক্ষ্মণকে ২ লাখ রুপি নগদ পুরস্কার ঘোষণা করেন। এছাড়া ২৩৬ রান পর্যন্ত প্রতি রানের জন্য ১ হাজার রুপি এবং ২৩৭ রান থেকে প্রতি রানের জন্য ২ হাজার রুপি করে বাড়তি পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
ক্রিকেট মহলের প্রতিক্রিয়া
এই ইনিংসটিকে অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি ইয়ান চ্যাপেল "গত দশকের সেরা ইনিংস" বলে অভিহিত করেছিলেন। মাইক কাওয়ার্ডের মতো বিশ্লেষকরা ব্রায়ান লারার ২৭৭ রানের ইনিংসের সঙ্গে লক্ষ্মণের এই ইনিংসের তুলনা করতে গিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। এমনকি রাহুল দ্রাবিড় পর্যন্ত স্বীকার করেছিলেন যে তিন নম্বর অবস্থানে খেলার জন্য লক্ষ্মণই সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি।
লক্ষ্মণের ব্যাটিং বৈশিষ্ট্য
শচীন টেন্ডুলকারের পর ভারতীয় ক্রিকেটের সেরা স্ট্রোক প্লেয়ার হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মণের এই ইনিংসে ছিল ৪৪টি বাউন্ডারি। মজার বিষয় হলো, তিনি সেঞ্চুরি করার পরই সাংবাদিকরা ডাবল সেঞ্চুরির কথা বলতে শুরু করেছিলেন, আর ডাবল সেঞ্চুরি হওয়ার পর আলোচনায় চলে এসেছিল ট্রিপল সেঞ্চুরির সম্ভাবনা।
লক্ষ্মণ স্বীকার করেছিলেন, "ট্রিপল সেঞ্চুরি পাওয়ার স্বপ্ন তো এখন দেখতেই পারি। তবে আগে দলের সিদ্ধান্ত জানা দরকার।" রঞ্জি ট্রফিতে দুটি ট্রিপল সেঞ্চুরি করার রেকর্ডধারী লক্ষ্মণের জন্য এটি অসম্ভব কিছু ছিল না।
ইতিহাসের পাতায় স্থান
এই ম্যাচটি টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সেরা প্রত্যাবর্তনের গল্প হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রথম ইনিংসে বিপর্যয়ের পর দ্বিতীয় ইনিংসে এমন জবাব দেওয়ার নজির খুব কমই আছে। লক্ষ্মণ-দ্রাবিড় জুটির এই অবদান ভারতীয় ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
সাংবাদিক সম্মেলনে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছিল যখন লক্ষ্মণের ২৭৫ রানের অপরাজিত ইনিংসের সম্মানে সকল সাংবাদিক করতালি দিতে দিতে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। হায়দরাবাদের সেই তরুণের মুখে তখন লাজুক হাসি, যিনি দলের জয়কে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
২০০১ সালের সেই মার্চ মাসে ইডেন গার্ডেনে লেখা এই ইতিহাস আজও ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে স্পন্দিত হয়। ভিভিএস লক্ষ্মণের ২৮১ রানের সেই ইনিংস শুধু সংখ্যায় বড় নয়, প্রেক্ষাপটে, গুরুত্বে এবং নাটকীয়তায় অমর হয়ে আছে ক্রিকেটের ইতিহাসে।
