লা রেমোন্তাদা: ৯ বছর আগে বার্সেলোনার ঐতিহাসিক কামব্যাকের দিন
ফুটবল ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা একটি রাত। ২০১৭ সালের ৮ মার্চ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ ষোলো রাউন্ডের দ্বিতীয় লেগে বার্সেলোনা অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল। প্রথম লেগে ৪-০ গোলে পিছিয়ে থেকে ক্যাম্প ন্যুতে পিএসজিকে ৬-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল বার্সা।
ভূমিকম্পের মতো কম্পন
ক্যাম্প ন্যু থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে অবস্থিত জিওসায়েন্সেস বার্সেলোনার সিসমোগ্রাফে রাত ১০টার দিকে মৃদু কম্পন ধরা পড়ে। দশ মিনিট পর আরেকটি কম্পন, আগেরটির চেয়ে একটু বেশি। রাত ১০টা ৫০ নাগাদ রিখটার স্কেলে মাত্রা ১-এর ভূমিকম্প নথিভুক্ত হয়। গবেষক জর্দি দিয়াজের মতে, "ষষ্ঠ গোলে এই ঘরানার সর্বকালের সেরা ভূকম্পন নথিভুক্ত করা হয়।"
৯৬ হাজার ৯২০ জন দর্শকের একসঙ্গে লাফানো ও গগনবিদারী চিৎকারই ছিল এই কম্পনের উৎস। ক্যাম্প ন্যুর মানুষ অতিশয় আনন্দে পৃথিবী নড়িয়ে দিয়েছিল।
পিছিয়ে থেকে যাত্রা শুরু
এক মাস আগে পার্ক দে প্রিন্সেসে প্রথম লেগে বার্সেলোনা ৪-০ গোলে হেরেছিল। ইউরোপিয়ান কাপ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ৬২ বছরের ইতিহাসে এত বড় ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে কেউ কখনো ফিরে আসতে পারেনি। বার্সার প্রধান প্রেস কর্মকর্তা হোসে ম্যানুয়েল লাজারো স্বীকার করেছিলেন, "ধরে নিয়েছিলাম, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শেষ।"
কোচ লুইস এনরিকেই প্রথম আশার বাণী শোনান। ফিরতি লেগের আগে তিনি জানিয়ে দেন মৌসুম শেষে বার্সা ছাড়বেন। এনএফএলে নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টসের ২৫ পয়েন্ট পিছিয়ে থেকে জয়ের গল্প দলে প্রেরণা জোগায়।
ম্যাচের নাটকীয় মোড়
ম্যাচ শুরুর আগে এনরিকে সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, "একটি দল যদি আমাদের চার গোল দিতে পারে, তাহলে আমরা তাদের ছয় গোল দিতে পারি।" তাঁর কথাই সত্যি প্রমাণিত হয়েছিল।
ম্যাচের ঘটনাপ্রবাহ:
- ৩ মিনিটে লুইস সুয়ারেজের গোলে এগিয়ে যায় বার্সা
- ৪০ মিনিটে লাভিন কুরজাওয়ার আত্মঘাতী গোলে স্কোর হয় ২-০
- ৫০ মিনিটে পেনাল্টি থেকে মেসির গোল (৩-০)
- ৬২ মিনিটে এডিনসন কাভানির গোলে পিএসজি এগিয়ে যায় (৩-১)
- ৮৮ মিনিটে নেইমারের ফ্রি-কিক থেকে গোল (৪-১)
- ৯১ মিনিটে নেইমারের পেনাল্টি গোল (৫-১)
- ৯৫ মিনিটে সের্হি রবার্তোর জয়সূচক গোল (৬-১)
৮৭ মিনিট পর্যন্ত বার্সাকে তিন গোল করতে হতো। শেষ আট মিনিটে নেইমারের দুটি গোল ও রবার্তোর গোলে ইতিহাস রচিত হয়।
খেলোয়াড়দের প্রতিক্রিয়া
এই হার পিএসজি খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল:
- এডিনসন কাভানি জীবনে প্রথমবারের মতো মনোবিদের কাছে থেরাপি নিতে যান
- ফ্লোরেন্স মাতুউদি বিষাদে আক্রান্ত হয়ে তাৎক্ষণিক অবসর নিতে চেয়েছিলেন
- লুকাস মউরা কেঁদেছিলেন বাকি রাত
অন্যদিকে বার্সা দলে গোলকিপার মার্ক-আন্দ্রে টের স্টেগেনের চিৎকার, "উই নেভার ডাই! উই আর বার্সেলোনা!" দলকে প্রেরণা যুগিয়েছিল।
ইতিহাসের পাতায় স্থান
এই ম্যাচ "লা রেমোন্তাদা" নামে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। স্প্যানিশ এই শব্দের অর্থ "কামব্যাক" বা "ঘুরে দাঁড়ানো"। এটি ছিল বার্সায় মেসি-সুয়ারেজ-নেইমার "এমএসএন" জুটির শেষ বড় জয়। ম্যাচের পরই নেইমার বুঝতে পেরেছিলেন, মেসি থাকতে তিনি বার্সায় প্রধান নায়ক হতে পারবেন না। বিশ্ব রেকর্ড ফিতে পিএসজিতে চলে যান তিনি।
যদিও বার্সা সেই মৌসুমে কোয়ার্টার ফাইনাল পেরোতে পারেনি এবং এনরিকে মৌসুম শেষে ছেড়ে দেন, কিন্তু লা রেমোন্তাদা ইউরোপিয়ান ফুটবলের অন্যতম সেরা কামব্যাক হিসেবে আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। নয় বছর পরও এই দিনটি বার্সা সমর্থক ও ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
