প্রথম দিন শেষে স্বস্তি নিয়ে মাঠ ছেড়েছেন লিটন-মুশফিক
প্রথম দিন শেষে স্বস্তি নিয়ে মাঠ ছেড়েছেন লিটন-মুশফিক

প্রথম দিনের খেলা শেষে স্বস্তি নিয়ে মাঠ ছেড়েছেন লিটন–মুশফিক। হঠাৎ করেই যেন রাজ্যের ক্লান্তি ভর করল শরীরে। ড্রেসিংরুমে ফেরার পথটাতে পা চলতে চাইছিল না। চেহারায় পড়া রোদের ঝিলিক ঢাকতে পারছিল না ক্লান্তি, হতাশা। টেস্ট ক্রিকেটকে রীতিমতো ওয়ানডে বানিয়ে ব্যাটিং করছিলেন এতক্ষণ, বাজে বলে তো বটেই, কখনো কখনো ভালো বলেও চালিয়ে দিচ্ছিলেন ব্যাট। দোর্দণ্ড প্রতাপে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিন অঙ্কের জাদুকরি সংখ্যায়। কিন্তু ওখানেই যে শেষ নাজমুল হোসেনের!

শেষ সেশনে মুমিনুল হকের ফেরাটাও হয়েছে প্রায় একই রকম, হতাশায় বাতাস ভারী করে। নাজমুলের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য; নাজমুল ফিরেছেন সেঞ্চুরি করে, মুমিনুল টেস্টে নিজের ১৪তম সেঞ্চুরি থেকে ৯ রান দূরে থাকতে। তবু এটা না বলে উপায় নেই যে পাকিস্তানের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টের প্রথম দিনে আজ বাংলাদেশের করা ৪ উইকেটে ৩০১ রানের সংগ্রহটাকে সাজিয়ে দিয়েছেন এ দুজনই।

নাজমুলের সেঞ্চুরি ও রেকর্ড

নাজমুল ফিফটি করা মানেই সেঞ্চুরি হয়ে যাওয়া। টেস্টে এখন পর্যন্ত ১৪ বার ফিফটি ছুঁয়ে ৯ বারই সেঞ্চুরি। গত বছর জুনে শ্রীলঙ্কায় গল টেস্টের দুই ইনিংসে সেঞ্চুরির পর চলতি মিরপুর টেস্ট পর্যন্ত খেলা পাঁচ টেস্টের চারটিতেই পেয়েছেন তিন অঙ্কের দেখা। কিন্তু আজকেরটিসহ ৯ সেঞ্চুরির সর্বশেষ দুটিতে তিন অঙ্কে পৌঁছে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে ফিরতে হয়েছে ড্রেসিংরুমে। আগের সেঞ্চুরিটি ছিল গত নভেম্বরে সিলেটে। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সেদিন ঠিক ১০০ করে আউট হয়ে গিয়েছিলেন নাজমুল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের সবুজ উইকেট রানপ্রসবা। শাহীন আফ্রিদির করা দিনের প্রথম বলে মাহমুদুল হাসানের দারুণ ফ্লিকে মারা বাউন্ডারি সে ঘোষণাই দিয়েছিল দিনের শুরুতে। পরের বলেও চার, যদিও সেটি আসে লেগ বাই থেকে। তবু স্লিপে একবার ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যাওয়া মাহমুদুল এবং আরেক ওপেনার সাদমান ইসলাম এই উইকেটে ব্যাটিংটা উপভোগ করে যেতে পারেননি। দলের ৩১ রানের মধ্যে ফিরতে হয় দুজনকেই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মুমিনুল-নাজমুলের জুটি

তৃতীয় উইকেটে ১৭০ রানের জুটি গড়েন মুমিনুল–নাজমুল। স্পোর্টিং উইকেটে বাংলাদেশের ব্যাটিংটাকে এরপরই জমিয়ে দিতে থাকেন নাজমুল আর মুমিনুল। ইনিংসের ১১তম ওভারে জুটি বেঁধে লাঞ্চ পর্যন্ত আর উইকেট পড়তে দেননি। দলকে ১০১ রানে পৌঁছে দিয়ে লাঞ্চ, বিচ্ছিন্ন হন চা–বিরতির আগে শেষ ওভারে নাজমুলের আউটে। তৃতীয় উইকেটে তাঁদের ১৭০ রানের জুটিতে ততক্ষণে দিনটা বাংলাদেশের হয়ে গেছে। হয়েছে একটা রেকর্ডও, পাকিস্তানের বিপক্ষে তৃতীয় উইকেটে এটিই এখন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানের জুটি।

টেস্টে নাজমুলের ফিফটি মানে সেঞ্চুরি, আর সেঞ্চুরি মানেই দেখার মতো কিছু। এর সপক্ষে দুটি তথ্যই যথেষ্ট—এখন পর্যন্ত ৪০ টেস্টের ক্যারিয়ারে নাজমুল ২৩৯৯ রান করেছেন ৫৪.৩০ স্ট্রাইক রেটে। আর ৯ সেঞ্চুরির ইনিংস মিলিয়ে স্ট্রাইক রেট ৬৪.৮১। সঙ্গে আজকের স্ট্রাইক রেটটাও (৭৭.৬৯) জানা থাকলে চোখের সামনে ভেসে উঠতে পারে তাঁর পুরো ইনিংসটাই।

পাকিস্তানের বোলিং ও মুশফিকের অপরাজিত ইনিংস

সকালের দিকে আফ্রিদি কিছুটা সুইং পাচ্ছিলেন। সেটি বাদ দিলে মিরপুরের উইকেটে অসহায়ই মনে হচ্ছিল পাকিস্তানের বোলারদের। বিশেষ করে ১০-১২ ওভারের পর নির্বিষ হয়ে যেতে থাকে তাঁদের বোলিং। নাজমুল আর মুমিনুলকে তেমন কোনো চ্যালেঞ্জই জানাতে পারেননি কেউ। পরে মুশফিকুর রহিম এসেও স্বচ্ছন্দে খেলেছেন। চতুর্থ উইকেটে মুমিনুলের সঙ্গে গড়েছেন ৭৫ রানের জুটি। ১০১তম টেস্টে ফিফটি থেকে দুই রান দূরে থেকে অপরাজিতভাবে দিন শেষ করেছেন মুশফিক। সঙ্গী লিটন দাস খেলছিলেন ৮ রান নিয়ে।

নোমান আলীর নিচু হয়ে আসা বলে এলবিডব্লু হওয়া মুমিনুলের ৯১ রানের ইনিংসে চার ছিল দশটি। তাঁর ২০০ বলের ধৈর্য পূর্ণতা পেত সেঞ্চুরি পেলে। একটু বেশিই খোলসে ঢুকে থাকা ব্যাটিং সেটি না পাওয়ার অন্যতম কারণ। নইলে মিরপুরের এই উইকেটে আরেকটু গতিশীল ব্যাটিং যে করা যেত, তা বোঝা গেছে নাজমুলের ব্যাটিং দেখেই।

নাজমুলের আক্রমণাত্মক ব্যাটিং

৭১ বলে ফিফটির পর ১৩০ বলে ১০১ রান, এক ডজন বাউন্ডারির সঙ্গে মেরেছেন দুটি ছক্কা। প্রথমটি সালমান আগাকে ডিপ স্কয়ার লেগ দিয়ে। মোহাম্মদ আব্বাসের অফ স্টাম্পের বাইরের বলে লং অন দিয়ে মারা নাজমুলের পরের ছক্কাটিকে তো দিনের সেরা শটই বলা যায়। কখনো কাভার ড্রাইভ, কখনো স্ট্রেইট ড্রাইভ—তাঁর বাউন্ডারিগুলোও এসেছে অনায়াস সব শটে, যার দুটি আবার শাহিন আফ্রিদির পরপর দুই বলে। নাজমুল সেঞ্চুরিতেও পৌঁছেছেন আব্বাসকে দৃষ্টিনন্দন এক কাভার ড্রাইভে বাউন্ডারি মেরে। উদ্‌যাপনে ড্রেসিংরুমের দিকে ব্যাট দেখালেন, মাঠে কপাল ছুঁইয়ে কৃতজ্ঞতা জানালেন সৃষ্টিকর্তার প্রতি। কিন্তু আব্বাসের পরের বলেই এলবিডব্লু, মুহূর্তে থেমে গেল ব্যাটিং বিনোদনের দারুণ এক প্রদর্শনী।

অধিনায়ক হিসেবে ততক্ষণে অবশ্য একটা জায়গায় সার্থক নাজমুল। প্রথম ইনিংসে ভালো রান করার যে প্রত্যাশা নিয়ে সিরিজটা শুরু করেছেন, সতীর্থদের সেই পথ দেখিয়ে গেছেন তিনি নিজেই।