আফগানিস্তানের সাবেক পেসার শাপুর জাদরানের জীবন-মৃত্যুর লড়াই: চতুর্থ পর্যায়ের এইচএলএইচ রোগে সংকট
আফগানিস্তানের সাবেক বাঁহাতি পেসার শাপুর জাদরান মারাত্মক ও প্রাণঘাতী রোগ ‘হেমোফ্যাগোসাইটিক লিম্ফোহিস্টিওসাইটোসিস’ (এইচএলএইচ) রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এই রোগে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অকেজো হতে শুরু করে, যা বর্তমানে চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী জুলাইয়ে ৩৯ বছরে পা দিতে যাওয়া শাপুরের অসুস্থতা বর্তমানে বেশ জটিল পর্যায়ে রয়েছে। গত জানুয়ারিতে চিকিৎসার জন্য তাঁকে ভারতের দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বর্তমানে সেখানকার একটি হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন তিনি।
ক্রিকেট মাঠ থেকে আইসিইউ বিছানায়: শাপুরের করুণ অবস্থা
৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার শাপুরের লম্বা চুল উড়িয়ে বোলিং করাটা ছিল বেশ দেখার মতো। দীর্ঘদেহি সেই পেসারই এখন আইসিইউর বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে থেকে প্রাণ বাঁচানোর লড়াই করছেন। তাঁর এইচএলএইচ রোগটি চতুর্থ পর্যায়ে আছে। সাধারণত শিশুদের মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা দিলেও ক্যানসার আক্রান্ত বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরও এইচএলএইচ হতে পারে। এই রোগে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে ওঠে, যার ফলে হাড়ের মজ্জা, যকৃৎ, প্লিহা, লিম্ফোনোডসহ বিভিন্ন টিস্যু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অসুস্থতার শুরু ও ভারতে চিকিৎসা
২০০৯ থেকে ২০২০ পর্যন্ত আফগানিস্তানের হয়ে ৮০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ (৪৪ ওয়ানডেতে ৪৩ উইকেট ও ৩৬ টি-টোয়েন্টিতে ৩৭ উইকেট) খেলা শাপুর প্রথম অসুস্থতা বোধ করেন গত বছর অক্টোবরে। তাঁর ছোট ভাই গামাই জাদরান জানান, আফগানিস্তানের চিকিৎসকেরা তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার পরামর্শ দেন। রশিদ খান ও আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (এসিবি) চেয়ারম্যান মিরওয়াইস আশরাফ ভারতে তাঁদের পরিচিত মহলে যোগাযোগ করায় শাপুরের ভারতীয় ভিসা দ্রুত পাওয়ার প্রক্রিয়াটি সহজ হয়। আশরাফ কথা বলেন আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহর সঙ্গে। আইপিএলে গুজরাট টাইটানসে খেলা আফগান তারকা স্পিনার রশিদ যোগাযোগ করেন ফ্র্যাঞ্চাইজি মহলে। শেষ পর্যন্ত ১৮ জানুয়ারি ভারতে পৌঁছান শাপুর এবং সেদিনই তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পরিবার ও ক্রিকেট মহলের সমর্থন
দিল্লিতে শাপুরের সঙ্গে আছেন তাঁর স্ত্রী ও আফগানিস্তানের সাবেক অধিনায়ক আসগর আফগান। গত ২৬ জানুয়ারি কানাডা থেকে শাপুরের কাছে যান তাঁর ভাই গামাই জাদরান। শাপুরের শারীরিক অবস্থা নিয়ে ইএসপিএনক্রিকইনফোকে গামাই বলেন, ‘খুবই মারাত্মক সংক্রমণ ছিল। যক্ষ্মাসহ (টিবি) পুরো শরীর সংক্রমিত হয়ে গিয়েছিল। এমআরআই ও সিটি স্ক্যান রিপোর্টে দেখা গেছে, সংক্রমণ ওর মস্তিষ্কেও ছড়িয়ে পড়েছে।’ গামাই জানান, শাপুর চিকিৎসায় সাড়া দিতে শুরু করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহ পর তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয় এবং তাঁরা নিকটস্থ একটি হোটেলে ওঠেন। কিন্তু এরপর আবারও সংক্রমণ দেখা দিলে তাঁকে পুনরায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
জটিলতা ও বর্তমান অবস্থা
হাসপাতালে প্রায় ২০ দিন থাকার পর শাপুরকে আবারও ছাড়পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু এরপর শাপুর পেটের সমস্যার কথা জানালে গামাই তাঁকে আবারও হাসপাতালে নিয়ে যান এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। গামাই বলেন, ‘ওর জ্বর আসতে শুরু করে এবং পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। লোহিত রক্তকণিকা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা একদম দুর্বল হয়ে পড়ে।’ গত ২৬ মার্চের দিকে রোজার মধ্যে শাপুরের হাড়ের মজ্জা বা বোন ম্যারো পরীক্ষা করা হয়। সেই পরীক্ষাতেই ধরা পড়ে যে, তিনি এইচএলএইচ রোগে আক্রান্ত এবং সেটি চতুর্থ পর্যায়ে রয়েছে।
ক্রিকেট মহলের অবিরত সহযোগিতা
গামাইও ক্রিকেটার। তিনি আফগানিস্তান ‘এ’ দলে খেলেছেন ব্যাটসম্যান হিসেবে। তিনি জানান, দেশের ক্রিকেট মহল শাপুরের পাশে পূর্ণ সমর্থন নিয়ে দাঁড়িয়েছে। গামাইয়ের ভাষ্যমতে, আসগর আফগান শাপুরের জন্য নিজের সাধ্যের বাইরে গিয়ে চেষ্টা করছেন। গত জানুয়ারিতে শাপুরের সঙ্গে ভারতে যাওয়া থেকে শুরু করে হাসপাতালে দিনের পর দিন রাত জাগা, সবই করছেন আসগর। বর্তমানে দুবাইয়ে থাকলেও শাপুরের জন্য দুবাই-দিল্লি নিয়মিত যাতায়াত করছেন আসগর। রশিদ খানও শুরু থেকেই শাপুরের শারীরিক অবস্থার খোঁজ রাখছেন। দিল্লিতে ও মুম্বাইয়ের একটি নামী হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি এ বছরের শুরুতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় তিনি শাপুরকে দেখতেও গিয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক সমর্থন ও আশার আলো
৩ এপ্রিল আফগান স্পিনার আল্লাহ গজনফর শাপুরকে দেখতে হাসপাতালে যান। আইপিএলে মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের হয়ে খেলা গজনফর দিল্লি ক্যাপিটালসের বিপক্ষে ম্যাচের জন্য সে সময় দিল্লিতে ছিলেন। সেই থেকে নিয়মিত গামাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন গজনফর। আফগানিস্তানের ওয়ানডে অধিনায়ক হাশমতউল্লাহ শহীদিসহ অনেক আফগান ক্রিকেটার শাপুরের অবস্থার খোঁজ নিতে ফোন করেছেন। আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (এসিবি) চেয়ারম্যান মিরওয়াইস আশরাফ গত রোববার হাসপাতালে গিয়ে শাপুরের সঙ্গে দেখা করেন। অন্য দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদিও গামাইকে ফোন করে খোঁজ নিয়েছেন। গামাই জানান, আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের আজ শাপুরকে দেখতে হাসপাতালে যাওয়ার কথা রয়েছে।
বর্তমান শারীরিক অবস্থা ও আশার কথা
বর্তমানে শাপুর তেমন একটা কথা বলতে পারেন না এবং বেশির ভাগ সময় ঘুমান বলেই জানান গামাই। দ্বিতীয়বার হাসপাতালে ভর্তির সময় শাপুরের ওজন ছিল ৯৮ কেজি। সেটা ১৪ কেজি কমে এখন দাঁড়িয়েছে ৮৪ কেজিতে। গামাইয়ের ভাষায়, ‘ওর শরীরে এখন একদমই শক্তি নেই।’ চার ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে শাপুর সবার বড়। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর কাঁধেই ছিল পরিবারের হাল। তবে আশা ছাড়ছেন না গামাই, ‘আমরা আশা করছি ও দিনে দিনে সুস্থ হয়ে উঠবে। সম্প্রতি ওকে যে স্টেরয়েড দেওয়া হচ্ছে, তা কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে। এটিই আমাদের মনে আশার আলো জাগাচ্ছে।’



