আড়ালের নায়কের আনুষ্ঠানিক বিদায়
মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের প্রেসবক্সে এলেন রুবেল হোসেন। আনুষ্ঠানিক বিদায়ের এই দিনে তাঁর সাথে ছিলেন ছেলে আয়ান। বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের নেতৃত্বে ক্রিকেট বোর্ড আয়োজন করেছিল এই বিদায়ী সম্মাননা অনুষ্ঠানের। বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড দ্বিতীয় ওয়ানডে ম্যাচের পূর্বে জাতীয় দলের সাবেক এই পেসারকে মাঠে এনে সংবর্ধনা জানানো হয়।
আবেগঘন মুহূর্ত ও স্মৃতিচারণ
দুই দলের খেলোয়াড় ও বিসিবি কর্মকর্তাদের সামনে সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রুবেল। তিনি কৃতজ্ঞতা জানান তাঁর একসময়ের সতীর্থদের প্রতি। তাসকিন আহমেদ ফিরিয়ে আনেন ২০১৫ বিশ্বকাপের স্মৃতি। অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পরপর দুই বলে দুই উইকেট নিয়ে ম্যাচ জিতানোর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি সবার মনে পড়িয়ে দেন তিনি।
প্রেসবক্সে অসংখ্য ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে রুবেল তাঁর স্বভাবসুলভ লাজুকতা বজায় রাখেন। একজন সাংবাদিক টক শোতে আসার আমন্ত্রণ জানালে তিনি বলেন, 'আমি তো কথা ভালো বলতে পারি না। কী বলতে আবার কী বলে ফেলি...!' খেলোয়াড়ি জীবনে ক্যামেরার সামনে তাঁর এই মুখচোরা অভিব্যক্তিই দেখেছে সবাই।
আড়ালে থাকার ইচ্ছা ও নিয়তির টান
রুবেল হোসেন যেন সব সময় আড়ালেরই এক নায়ক হয়ে থাকতে চাইতেন। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, নিয়তিও বরাবর তাঁকে সেদিকেই টেনেছে। এক ম্যাচে ভালো বোলিং করলেও পরের ম্যাচে টিম কম্বিনেশনের কারণে একাদশে জায়গা পেতেন না। মাশরাফি বিন মুর্তজার সময়ে পেস বোলিং কোটায় অগ্রাধিকার পাওয়ায় রুবেল প্রায়ই ডাগআউটে থাকতেন।
পরবর্তীতে তাসকিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমানদের আগমনে প্রতিযোগিতা আরও বেড়ে যায়। পেস বোলিংয়ে ডানহাতি-বাঁহাতি কম্বিনেশন ও বোলিংয়ের ধরনের বিবেচনায় তিনি আরও পিছিয়ে যান। কিন্তু যখনই খেলতেন, বিপদের সময় তিনি হয়ে উঠতেন অধিনায়কের বড় ভরসা। উইকেট না পড়লে ব্রেকথ্রুর জন্য রুবেলকে আনা হতো। খাঁচা থেকে বের হওয়া বাঘের মতো তেড়েফুঁড়ে বল করতেন তিনি।
শেষ বিদায় ও ক্রিকেট নার্সারির প্রতি শ্রদ্ধা
অনুষ্ঠান শেষে রুবেল ছেলেকে নিয়ে চলে যান মাঠের মাঝখানে। উইকেটের পাশে গিয়ে বসেন, ছুঁয়ে দেখেন উইকেটটাকে। 'হোম অব ক্রিকেটে'র প্রতি তাঁর এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ মনে করিয়ে দেয় শচীন টেন্ডুলকারের বিদায়ের দিনটিকে। শচীনও সেদিন ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের উইকেটে দাঁড়িয়ে কেঁদেছিলেন, বিদায় বলেছিলেন প্রিয় 'নার্সারি'কে।
রুবেলের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ ছিল ২০২১ সালের ১ এপ্রিল অকল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টুয়েন্টি। শেষ ওয়ানডে খেলেছেন সে বছরই, আর শেষ টেস্ট তার আগের বছর। গত ছয়-সাত বছর ধরেই তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অনুপস্থিত ছিলেন। এই সময়ে জাতীয় দলে ভিড় করেছে নতুন নতুন পেসার, যাদের অনেকে এখন অভিজ্ঞ হয়ে গেছেন।
বিস্মৃতির আড়ালে হারানো ক্রিকেটার
১৫ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবসরের ঘোষণা দিলে অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে—এত দিনও কি তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ছিলেন! গত কয়েক বছর ধরে রুবেলের পরিচয় হয়ে গিয়েছিল মোটর বাইক ব্যবসায়ী হিসেবে। বিস্মৃতির আড়ালে হারাতে হারাতে ক্রিকেটার রুবেল আবার সামনে এলেন অবসরের ঘোষণা দিয়ে, যেন আগের মতোই 'আড়ালের নায়ক' হয়ে।
রুবেলের পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই বিশেষ আলোচনা ছিল তাঁর বোলিং অ্যাকশন নিয়ে। লাসিথ মালিঙ্গার মতো পুরোপুরি স্লিঙ্গিং অ্যাকশন নয়, আবার অনেকটাই সে রকম। বাংলাদেশ দলের সাবেক পেস বোলিং কোচ চম্পকা রমানায়েক একবার বলেছিলেন, 'এটাই রুবেলের শক্তি, এই অ্যাকশনের বোলিংয়ের কারণেই তো পেসার হান্ট থেকে তাঁকে নেওয়া এবং তাঁর জাতীয় দলে আসা।'
গত কয়েক বছরে ঘরোয়া ক্রিকেটেও অনেকটাই অনিয়মিত ছিলেন রুবেল। গত দুই বছরে খেলেছেন একটি মাত্র ম্যাচ, সেটিও ২০২৫ সালের জানুয়ারির বিপিএলে। সেই পর্যন্তও তাঁর বোলিং অ্যাকশনে তেমন পরিবর্তন আসেনি। ঘরোয়া ক্রিকেটে যদি আবার কখনো তাঁকে দেখা যায়, তখনো নিশ্চয়ই রুবেল 'র' রুবেলের মতোই থাকবেন। সেই বিশেষ বোলিং অ্যাকশন, সেই মুখচোরা স্বভাব, নিজেকে আড়ালে রেখে হঠাৎই শিকল-ছেঁড়া বাঘের মতো লাফিয়ে ওঠা রুবেল হোসেন।



