বিশ্বকাপে ভিন্ন দেশের জার্সিতে চার জোড়া ভাই
বিশ্বকাপে ভিন্ন দেশের জার্সিতে চার জোড়া ভাই

একই পরিবারে জন্ম, একই ছাদের নিচে বেড়ে ওঠা, শৈশবে একই মাঠে ফুটবলের হাতেখড়ি—তবুও বিশ্বকাপের মঞ্চে এসে দুই ভাই দাঁড়াবেন দুই ভিন্ন দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। এমন দৃশ্য একসময় বিরল হলেও আধুনিক ফুটবলে এটি ক্রমেই পরিচিত বাস্তবতা হয়ে উঠছে। বিশ্বজুড়ে মানুষের অভিবাসন, বহুসাংস্কৃতিক পরিচয় এবং দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রভাব এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলেও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

চার জোড়া ভাইয়ের অনন্য উদাহরণ

২০২৬ বিশ্বকাপে সেই বাস্তবতারই এক অনন্য উদাহরণ দেখা যাচ্ছে, যেখানে চার জোড়া ভাই খেলছেন চারটি ভিন্ন জার্সিতে, কিন্তু রক্তের সম্পর্কে তারা একে অপরের সবচেয়ে কাছের মানুষ। এই তালিকার সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া দুই ভাই দেজিরে দুয়ে ও গ্যুয়েলা দুয়ে। ছোট ভাই দেজিরে বর্তমানে ফ্রান্সের জাতীয় দলের অংশ হিসেবে খেলছেন এবং ইউরোপের অন্যতম বড় ক্লাব প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনের হয়ে নিজের প্রতিভার প্রমাণ দিচ্ছেন। অন্যদিকে বড় ভাই গ্যুয়েলা নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের জন্য বেছে নিয়েছেন পারিবারিক শিকড়ের দেশ আইভরি কোস্টকে। সম্প্রতি এক প্রীতি ম্যাচে দুই ভাইয়ের গল্প নতুন করে আলোচনায় আসে। গ্যালারিতে বসে দেজিরে দেখেন, বড় ভাই গ্যুয়েলা দুর্দান্ত একটি গোল করে ফ্রান্সকে হারাতে সাহায্য করেছেন। মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও ম্যাচের আগে-পরে দুই ভাইয়ের পারস্পরিক ভালোবাসা ও সমর্থনের গল্প ফুটবলপ্রেমীদের আবেগ ছুঁয়ে গেছে।

উইলিয়ামস ভাইয়ের গল্প

একই ধরনের গল্প রয়েছে স্পেনের বিখ্যাত উইলিয়ামস ভাইদের জীবনেও। বাস্ক অঞ্চলে জন্ম নেওয়া দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট ভাই নিকো উইলিয়ামস বর্তমানে স্পেন জাতীয় দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ে তার অবদান ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে তার বড় ভাই ইনিয়াকি উইলিয়ামস ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। একসময় স্পেনের হয়ে খেললেও পরবর্তীতে তিনি নিজের পারিবারিক শিকড়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে ঘানার জার্সি গায়ে তোলেন। বর্তমানে তিনি আফ্রিকান দেশটির অন্যতম নির্ভরযোগ্য ফুটবলার হিসেবে পরিচিত।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লুকাশেন ও ব্রবি: সৎভাইয়ের ভিন্ন পথ

ঘানার স্কোয়াডে আরও একটি পারিবারিক গল্প রয়েছে। নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া ডিফেন্ডার ডেরিক লুকাশেন শেষ মুহূর্তে ঘানার দলে সুযোগ পেয়েছেন। তবে এই বিশ্বকাপে তার জন্য আরেকটি বিশেষ বিষয় হলো, তার সৎভাই ব্রায়ান ব্রবি খেলছেন নেদারল্যান্ডসের হয়ে। একই মায়ের সন্তান হলেও দুই ভাই আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভিন্ন দুই দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। একদিকে লুকাশেন ঘানার রক্ষণভাগে অবদান রাখছেন, অন্যদিকে ব্রবি ডাচ আক্রমণভাগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে মাঠে নামছেন।

সুটার ভাই: স্কটল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া

ইউরোপ ও আফ্রিকার বাইরেও এমন গল্প দেখা যাচ্ছে স্কটল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে। স্কটল্যান্ডের অ্যাবারডিনে জন্ম নেওয়া দুই ভাই জন সুটার ও হ্যারি সুটারের আন্তর্জাতিক ফুটবল যাত্রাও ভিন্ন পথে এগিয়েছে। পারিবারিক সূত্রে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় ছোট ভাই হ্যারি অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন এবং দীর্ঘদিন ধরে দলটির রক্ষণভাগের অন্যতম ভরসা হিসেবে খেলছেন। অন্যদিকে বড় ভাই জন সুটার স্কটল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।

আধুনিক ফুটবলে পরিবর্তিত বাস্তবতা

আধুনিক ফুটবলে এই ধরনের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে ইউরোপে কয়েক দশক ধরে চলা অভিবাসনের ফলে বহু ফুটবলারের পরিচয় এখন একাধিক দেশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ফলে তারা জন্মভূমি, পারিবারিক শিকড় কিংবা ব্যক্তিগত অনুভূতির ভিত্তিতে জাতীয় দল নির্বাচন করার সুযোগ পাচ্ছেন। এ কারণেই বর্তমানে আফ্রিকার অনেক দেশের স্কোয়াডে ইউরোপে জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা ফুটবলারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। আলজেরিয়া, মরক্কো, সেনেগাল ও তিউনিসিয়ার মতো দেশগুলো এর উজ্জ্বল উদাহরণ।

পূর্ববর্তী দৃষ্টান্ত

অবশ্য ভাইদের ভিন্ন দেশের হয়ে বিশ্বকাপে খেলার ঘটনা একেবারে নতুন নয়। ফুটবলপ্রেমীরা এখনো স্মরণ করেন জেরোমে বোয়াটেং ও কেভিন-প্রিন্স বোয়াটেংয়ের গল্প। একজন খেলেছিলেন জার্মানির হয়ে, অন্যজন ঘানার হয়ে। ২০১০ এবং ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে দুই ভাইয়ের মুখোমুখি লড়াই আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়ে পরিণত হয়েছিল।

তবে এবারের বিশ্বকাপে একসঙ্গে চার জোড়া ভাইয়ের ভিন্ন দেশের হয়ে অংশগ্রহণ বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এটি শুধু ফুটবলের গল্প নয়, বরং আধুনিক বিশ্বের পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতারও প্রতিফলন। জাতীয়তা, সংস্কৃতি এবং পারিবারিক পরিচয়ের নানা স্তর পেরিয়ে এই ফুটবলাররা আজ বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করছেন। জার্সির রং ভিন্ন হতে পারে, জাতীয় সংগীতও আলাদা হতে পারে, কিন্তু ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের বন্ধন অটুটই থাকে। আর সেই মানবিক গল্পগুলোই বিশ্বকাপকে কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং বৈশ্বিক সংযোগ ও আবেগের এক মহামঞ্চে পরিণত করে।