ফুটবল বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচেই জয় তুলে নেওয়ার জন্য দলগুলো সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠানোর জন্য মরিয়া থাকে, অন্যদিকে রক্ষণভাগের মূল লক্ষ্য থাকে গোল হজম এড়ানো। তবে ফুটবলের অনিশ্চয়তা, কৌশলগত ভুল, প্রতিপক্ষের অসাধারণ আক্রমণ কিংবা দুই দলের শক্তির বিশাল ব্যবধানের কারণে কখনো কখনো এমন কিছু ম্যাচ দেখা যায়, যেখানে গোল যেন বন্যার মতো আসে। বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন অনেক ম্যাচ রয়েছে, যেগুলো শুধু ফলাফলের জন্য নয়, বরং গোলের সংখ্যার কারণেও আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।
বিশ্বকাপে এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি গোল
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে সাধারণত দলগুলো সতর্ক ফুটবল খেলে। ফলে বড় ব্যবধানে জয় খুব বেশি দেখা যায় না। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, কিছু ম্যাচে এক দল প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি ছাপিয়ে গিয়ে গোলের উৎসব করেছে। এসব ম্যাচে কখনো রক্ষণভাগের দুর্বলতা, কখনো আক্রমণভাগের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স, আবার কখনো দুই দলের মানের পার্থক্য বড় ব্যবধানের ফলাফল তৈরি করেছে। সেই সব ম্যাচই আজ বিশ্বকাপ ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
হাঙ্গেরির অনন্য রেকর্ড
বিশ্বকাপে এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি গোল করার রেকর্ডটি এখনো ধরে রেখেছে হাঙ্গেরি। ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে এল সালভাদরের বিপক্ষে হাঙ্গেরি যে ফুটবল প্রদর্শন করেছিল, তা আজও বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনন্য। ম্যাচটিতে হাঙ্গেরি প্রতিপক্ষের জালে ১০ বার বল পাঠায় এবং ১০-১ গোলের বিশাল জয় তুলে নেয়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো দল এর চেয়ে বেশি গোল করতে পারেনি। চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই রেকর্ড এখনো অক্ষত রয়েছে।
হাঙ্গেরির নাম শুধু ১০ গোলের রেকর্ডেই সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপেও তারা গোলবন্যা বইয়ে দিয়েছিল। সেই আসরে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ৯-০ গোলের বড় জয় তুলে নেয় ইউরোপের দেশটি। ম্যাচজুড়ে তাদের আক্রমণভাগ ছিল অপ্রতিরোধ্য। একই টুর্নামেন্টে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষেও তারা ৮-৩ গোলের চমকপ্রদ জয় পেয়েছিল। ফলে ১৯৫৪ সালের হাঙ্গেরি দলকে অনেকেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণভাগের দল হিসেবে বিবেচনা করেন।
যুগোস্লাভিয়ার বড় জয়
বিশ্বকাপের বড় ব্যবধানে জয়ের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে সাবেক যুগোস্লাভিয়াও। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে আফ্রিকার প্রতিনিধি জায়ারের বিপক্ষে তারা ৯-০ গোলের বিশাল জয় পায়। ম্যাচটিতে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছিল যুগোস্লাভিয়া এবং প্রতিপক্ষকে কোনো সুযোগই দেয়নি। সেই জয় এখনো বিশ্বকাপের অন্যতম বড় ব্যবধানের ফলাফল হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
দুই দলের মিলিত গোলের রেকর্ড
শুধু একতরফা ম্যাচ নয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসে এমন কিছু ম্যাচও আছে যেখানে দুই দল মিলে অসংখ্য গোল করেছে। সেই তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচগুলোর একটি ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল, যেখানে মুখোমুখি হয়েছিল অস্ট্রিয়া ও সুইজারল্যান্ড। ‘ব্যাটল অব লসান’ নামে পরিচিত সেই ম্যাচটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি গোল হওয়া ম্যাচ হিসেবে এখনো রেকর্ড বইয়ে রয়েছে। রোমাঞ্চকর ওই লড়াইয়ে অস্ট্রিয়া ৭-৫ গোলে জয় পায় এবং ম্যাচে মোট ১২টি গোল হয়। দুই দলের আক্রমণভাগের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ও রক্ষণভাগের দুর্বলতার কারণে ম্যাচটি আজও ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
পশ্চিম জার্মানির ৭-২ জয়
একই ১৯৫৪ বিশ্বকাপে আরেকটি বড় ব্যবধানের ম্যাচ দেখা যায় প্লে-অফ পর্বে। সেখানে পশ্চিম জার্মানি ৭-২ গোলে তুরস্ককে পরাজিত করে। গোলের ছড়াছড়িতে ভরা এই ম্যাচও বিশ্বকাপের উচ্চ স্কোরিং ম্যাচগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়।
ফ্রান্সের ৭-৩ জয়
এর কয়েক বছর পর ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে ফ্রান্সও নিজেদের আক্রমণাত্মক শক্তির প্রমাণ দেয়। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে ফরাসিরা ৭-৩ গোলের জয় তুলে নেয়। ম্যাচটিতে দুই দলই গোল করলেও আক্রমণে ফ্রান্স ছিল অনেক বেশি কার্যকর। ফলে বড় ব্যবধানের জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে তারা।
আধুনিক যুগের স্মরণীয় ম্যাচ
আধুনিক যুগের বিশ্বকাপেও বড় ব্যবধানের ম্যাচের অভাব নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত এবং অবিশ্বাস্য ফলাফল নিঃসন্দেহে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত সেই আসরে স্বাগতিক ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়েছিল জার্মানি। নিজেদের সমর্থকদের সামনে খেলতে নেমে ব্রাজিলের কাছ থেকে ভালো কিছু প্রত্যাশা ছিল সবার। কিন্তু ম্যাচটি পরিণত হয় তাদের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতিগুলোর একটিতে। জার্মানি শুরু থেকেই আক্রমণের ঝড় তোলে এবং ব্রাজিলের রক্ষণভাগকে বারবার ভেঙে দেয়। শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ৭-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে জিতে নেয় জার্মানরা। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এমন একতরফা ফলাফল ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। সেই হারকে অনেকেই ব্রাজিলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল ট্র্যাজেডিগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেন।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই ধরনের বড় জয়গুলো শুধু পরিসংখ্যানের অংশ নয়, বরং ফুটবলের নাটকীয়তা ও অনিশ্চয়তারও প্রতীক। কখনো কোনো দল নিজেদের সেরা খেলাটা উপহার দিয়ে প্রতিপক্ষকে বিধ্বস্ত করেছে, আবার কখনো কোনো শক্তিশালী দল অপ্রত্যাশিতভাবে বড় ব্যবধানে হেরে ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। এবারের বিশ্বকাপকে ঘিরেও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নতুন ফরম্যাট, বাড়তি ম্যাচ এবং আরও বেশি দলের অংশগ্রহণের কারণে অনেকেই মনে করছেন, আসন্ন আসরে হয়তো নতুন কিছু রেকর্ডের জন্ম হতে পারে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জয় কিংবা সর্বাধিক গোলের ম্যাচের তালিকায় নতুন কোনো অধ্যায় যোগ হয় কি না, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।



