রবার্ট লেভানডফস্কি বার্সেলোনায় এসেছিলেন অনাড়ম্বরের মধ্যে। সমুদ্রপাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, এমন সময় ক্যামেরা নিয়ে এক ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন বার্সেলোনা সমর্থকদের—তিনি আসছেন। সেই ভিডিওটাও করে দিয়েছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের সঙ্গী অ্যানা লেভানডফস্কা। বার্সা সমর্থকদের মনে যেন আশার আলো একটু করে জ্বলে উঠেছিল সেদিন।
বার্সেলোনার হন্যে হয়ে খোঁজা
লেভানডফস্কির জন্য বার্সেলোনা হন্যে হয়ে ঘুরেছে অনেক দিন। কোনোভাবেই তাঁকে ছাড়তে রাজি ছিল না বায়ার্ন মিউনিখ। বছরের পর বছর ধরে তিনি ছিলেন বায়ার্নের তুরুপের তাস। আরাম-আয়েশ আর ট্রফি জয়ের নিশ্চয়তা যেন পেয়ে বসেছিল তাঁকে। সেখান থেকে ভঙ্গুর বার্সেলোনায় পাড়ি জমাবেন, এমনটা ভাবাও কঠিন। একে তো মেসিপরবর্তী বার্সেলোনায় ঠিক নেই কিছুই। সঙ্গে তাদের ওপর বিশাল দেনার চাপ। দেনার পরিমাণ এতই যে বার্সা যদি স্বাক্ষরও করায়, তাঁকে কাগজে–কলমে রেজিস্টার করতে পারবে কি না, সে নিশ্চয়তা নেই।
পোলিশ স্ট্রাইকার সেটাকেই নিয়েছিলেন চ্যালেঞ্জ হিসেবে। তাঁর ক্যারিয়ারজুড়ে রেকর্ডের অভাব নেই। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে এমন কিছু নেই, যা জেতেননি। ব্যালন ডি’অর জেতার দ্বারপ্রান্তে ছিলেন—বেরসিক করোনা আঘাত না হানলেই হয়তো…।
কঠিন পথ বেছে নেওয়া
তবু কঠিনটাকেই বেছে নিলেন লেভানডফস্কি। কারণ, তিনি জানতেন, ফুটবল–বিশ্বটা বদলে যায় অনেক দ্রুত। মানুষের মনে বেঁচে থাকতে হলে চাই কঠিন চ্যালেঞ্জ। বায়ার্নের জার্সিতে সর্বজয়ী লেভানডফস্কির কথা ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক, কিন্তু বার্সেলোনার দুর্দিনে পাশে থাকার গল্প—সেটা লেখার মানুষ অনেক কম। লেভানডফস্কি সেই চ্যালেঞ্জটাই নিলেন। ২০২২ সালের গ্রীষ্মে বার্সেলোনার গল্পে যোগ দিলেন রবার্ট লেভানডফস্কি।
বার্সেলোনায় প্রথম মৌসুমের সাফল্য
লিওনেল মেসির বিদায়ের পর রীতিমতো খোঁড়া হয়ে গিয়েছিল বার্সেলোনার আক্রমণভাগ। ভারী ভারী নাম আছে বৈকি, কিন্তু প্রতিপক্ষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো চ্যালেঞ্জটা নেই কারও মনে। লেভানডফস্কি এসে সেই ভয়টা ফিরিয়ে আনলেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, এত বছর জার্মান লিগে খেলে এসে বার্সেলোনায় মানিয়ে নিতে পারবেন তো? জার্মানির মতো আক্রমণাত্বক ফুটবল স্পেন খেলে না। নিচের দিকের দলগুলো পারলে ১১ জন নিয়েই ডিফেন্স করতে বসে যায়। সেখানে রবার্ট লেভানডফস্কির মতো খেলোয়াড়কে বাক্সবন্দী করা খুব একটা কঠিন কিছু নয়। কিন্তু প্রথম মৌসুমেই তিনি গোল করলেন ৩৩টি। নিন্দুকের মুখে ঝামা ঘসে বগলদাবা করলেন লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতার ‘পিচিচি ট্রফি’টা। তিন বছর পর কাতালুনিয়ায় ফিরল লা লিগা শিরোপা।
বার্সেলোনা ব্র্যান্ডের পুনরুজ্জীবন
রবার্ট লেভানডফস্কির আগমন বদলে দিয়েছিল বার্সেলোনা ‘ব্র্যান্ড’টার চিত্র। মেসির প্রস্থানের পর দেউলিয়া হওয়ার দশা ছিল ক্লাবটির, দুইয়ে মিলে সবাই আশা হারিয়ে ফেলেছিলেন বার্সেলোনার ওপর থেকে। পরপর দুই মৌসুম ইউরোপা লিগ খেলে রীতিমতো খাদের কিনারায় চলে গিয়েছিল বার্সা। খেলোয়াড় কেনার টাকা নেই, কিনলেও নাম লেখাতে হিমশিম খাচ্ছে। ভবিষ্যৎ আয়, টিভি–স্বত্ব থেকে শুরু করে মাঠের নাম পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিল তারা। এমন সময়ে লেভানডফস্কি এসে শুধু বার্সেলোনাকে ট্রফি জেতাননি; ম্যানেজমেন্ট, দর্শক থেকে শুরু করে স্পনসর, সবার মনে নতুন করে ভরসা এনে দিয়েছেন।
ত্রাতা থেকে বড় ভাই
এমন বহুদিন গেছে, লেভানডফস্কি একাই হয়ে উঠেছেন ত্রাতা। খেলা জমছে না, ট্যাকটিকস কাজে দিচ্ছে না, পুরো দল খাদের কিনারে—ঠিক তখনই লেভানডফস্কি জিতিয়ে এনেছেন ম্যাচ। রবার্ট লেভানডফস্কি শুধু ‘ত্রাতা’ নন, হয়ে উঠেছিলেন ড্রেসিংরুমের বড় ভাই। বার্সেলোনার দলে লা মাসিয়া থেকে আসা ট্যালেন্টের কোনো অভাব ছিল না কখনোই। কিন্তু মেসি চলে যাওয়ার পর একজন বড় ভাই হয়ে আগলে রাখার মতো কেউ ছিলেন না। পেদ্রি, গাভি কিংবা লামিনে ইয়ামালদের হাত ধরে খেলা বোঝানোর মতো একজন বড় ভাই দরকার ছিল। সেটাই করেছেন লেভানডফস্কি।
চার মৌসুমের অর্জন
গত চার মৌসুম ধরে লেভানডফস্কি ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বার্সেলোনার। ৪ বছরে তিন লা লিগা আর এক কোপা দেল রে শিরোপা ঠিক পুরো চিত্রটা কখনোই বলবে না। লেভানডফস্কি এসেছিলেন চ্যালেঞ্জ নিতে, বার্সেলোনার দুঃসময়ের এক সারথী হয়ে। যখন দল ছাড়ছেন, তত দিনে বার্সা আবারও ডানা মেলতে শুরু করেছে। নতুন করে আশা করতে শুরু করেছে।
লেভানডফস্কি এখনো তাঁর নতুন গন্তব্য জানাননি। তবে যেখানেই যান না কেন, বার্সেলোনা সমর্থকদের কাছে তাঁর আগমনের গল্পটা হয়ে থাকবে রূপকথার থেকেও বেশি কিছু। যিনি এসেছিলেন, আশার ভেলায় দলকে ভাসিয়ে আবার চলেও গিয়েছেন। যাওয়ার আগে বাঁচিয়ে গিয়েছেন বার্সেলোনাকে।



