স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো ১০০ বছর বয়সে পা দিয়েছেন। সবার কাছে প্রকৃতিপ্রেমী হিসেবেই বেশি পরিচিত তিনি। লন্ডনের বাইরে কখনো থাকতে না পারা অ্যাটেনবরো যে শুধু প্রকৃতির কথাই শুনেছেন, তা কিন্তু নয়। তাঁর হাত ধরে আজীবনের জন্য বদলে গিয়েছিল টেনিস খেলাও। বর্তমান সময়ে টেনিস বল বলতেই চোখের সামনে যে হলুদ গোলক ভেসে ওঠে, তার পেছনে অবদান কিন্তু স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরোর।
রঙিন টেলিভিশনের যুগে সাদা বলের সমস্যা
এই ঘটনার সূত্রপাত ষাটের দশকে। অ্যাটেনবরো তখন কাজ করেন বিবিসির স্টুডিও কন্ট্রোলার হিসেবে। রঙিন টেলিভিশন সবেমাত্র এসেছে সবার কাছে। অ্যাটেনবরো তাই চাইতেন সবাই যেন সেরাটা দেখতে পারেন। বাস্তবে মাঠে বসে যেভাবে দেখা যায়, ঠিক সেভাবেই যেন টিভির সামনে সোফায় বসেও সবাই দেখতে পারেন খেলাটা। সে কারণে ১৯৬৭ সালে প্রথমবারের মতো উইম্বলডনে রঙিন ক্যামেরা পাঠান তিনি। প্রথমবারের মতো রঙিন উইম্বলডন দেখল ব্রিটিশরা। কিন্তু এরপরই তাঁর কাছে বিভিন্ন চিঠি পাঠাতে শুরু করল ভক্তরা। উইম্বলডন নাকি তারা ঠিকমতো দেখতেই পারেনি, কারণ বল স্পষ্ট নয়। কোর্টের সাদা দাগ আর খেলোয়াড়দের সাদা পোশাকের ভিড়ে সাদা রঙের বলটি খুঁজে পাওয়া ছিল দর্শকদের জন্য দুঃসাধ্য।
সাদা বলের ঐতিহ্য
আগে টেনিস খেলা হতো সাদা বলে। টেনিস খেলা আবিষ্কারের পর থেকে প্রায় সব জায়গাতেই ব্যবহার করা হতো সাদা বল। সাদা বল ব্যবহারের সুবিধা আছে বৈকি। একে তো দেখতে সুবিধা, অন্যদিকে সহজে দেখাও যায়। বিশেষ করে যখন টিভি পর্দায় খেলা দেখানো শুরু হলো, তখন খেলা দেখার জন্য সাদা বলই ছিল সবচেয়ে দরকারি। কারণ, মাঠের রং ধূসর কিংবা কালচে হয়ে গেলেও বল থাকত সব সময়ই স্পষ্ট, ধবধবে সাদা।
ডেভিড অ্যাটেনবরোর উদ্যোগে পরিবর্তন
ডেভিড অ্যাটেনবরো দর্শকদের কথা শুনলেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি সরাসরি দেখা করলেন ইন্টারন্যাশনাল টেনিস ফেডারেশন (আইটিএফ)-এর সঙ্গে। তাদের বললেন, টেনিসকে যদি সবার কাছে পৌঁছাতে চাও, তবে বলের রং এখনই পরিবর্তন করো। আইটিএফ-ও বলের রং নিয়ে শুরু করল গবেষণা। গবেষণায় দেখা গেল, 'অপটিক ইয়েলো' বা উজ্জ্বল হলুদ রংটাই টিভি পর্দায় বেশি ফুটে ওঠে। গবেষণার কাজ করার জন্য অ্যাটেনবরো নিজ উদ্যোগে ক্যামেরা পাঠিয়েছিলেন আইটিএফে। অবশেষে প্রায় পাঁচ বছর গবেষণার পর ১৯৭২ সালে আইটিএফ আনুষ্ঠানিকভাবে হলুদ বল ব্যবহারের অনুমতি দেয়।
প্রথম গ্র্যান্ডস্লামে হলুদ বল
প্রথমবারের মতো ১৯৭৩ সালে ইউএস ওপেনে ব্যবহার করা হয় হলুদ বল। সেটাই ছিল প্রথম কোনো গ্র্যান্ডস্লামে হলুদ বল ব্যবহার করা। এরপর একে একে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন আর ফ্রেঞ্চ ওপেনও শুরু করে হলুদ বল ব্যবহার। কিন্তু বরাবরের মতোই 'ঐতিহ্য'-এর দোহাই দিয়ে সাদা বল ব্যবহার করে যেতে লাগল উইম্বলডন। প্রায় সব টুর্নামেন্ট হলুদ বলে চলে গেলেও প্রায় এক যুগ 'গোঁ' ধরে বসে ছিল তারা। অবশেষে ১৯৮৬ সালে এসে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় তারা। সবার শেষ টুর্নামেন্ট হিসেবে হলুদ বল চালু করে উইম্বলডন কর্তৃপক্ষ। এখন সব টুর্নামেন্টেই ব্যবহার করা হয় হলুদ বল।
রঙিন সম্প্রচারের জেদ
পুরো ব্রিটেনে রঙিন সম্প্রচার চালু করতে কম বেগ পোহাতে হয়নি অ্যাটেনবরোকে। রেডিও টাইমসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, 'সরকার আমাদের কোনোভাবেই অনুমতি দিচ্ছিল না। যখন দিল, তখন হাতে সময় ছিল মাত্র ৯ মাস। প্রকৌশলীরা দামী ক্যামেরা কিনতে ভয় পাচ্ছিলেন পাছে তা দ্রুত পুরোনো হয়ে যায়। কিন্তু রঙিন সম্প্রচারে প্রথম হওয়ার এক জেদ আমার মধ্যে ছিল। অবশেষে সেটাই আমরা করে দেখিয়েছি।' সেই জেদ দেখিয়েছিলেন বলেই আজ সবার ঘরে ঘরে টিভি মানেই রঙিন। সাদা-কালো টিভি প্রায় হারিয়ে গেছে কালের গহ্বরে।
হলুদ নাকি সবুজ? বিতর্ক এখনও
যদিও প্রায় ৫০ বছর পর এসেও অনেকের মধ্যেই ঝগড়া লাগে, টেনিসের বলের রং কি আসলে হলুদ? নাকি সবুজ? খোদ রজার ফেদেরার পর্যন্ত এই বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। তবে রং যাই হোক না কেন, অ্যাটেনবারোর সেই বুদ্ধি ছাড়া টেনিস দেখা আজও হয়তো দর্শকদের জন্য এক ঝাপসা অভিজ্ঞতাই থেকে যেত।



