সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ঢুকলেই চোখে পড়ে চারপাশের অপার সবুজ। বর্ষার ছোঁয়ায় গ্রিন গ্যালারির ঘাসগুলো আরও গাঢ় ও জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বিদেশি দলের ড্রেসিং রুমের পাশের পুরোনো ফিকাস প্রজাতির গাছটি এখন অনেক বেশি বিস্তৃত; তার ছায়াতেই জমে ওঠে দর্শক আর কর্মীদের ছোট ছোট আড্ডা। পামগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তাকর্মীদের দেখে মনে হয়, ব্যস্ত ডিউটির ফাঁকে এটাই তাদের ক্ষণিকের শান্তির আশ্রয়।
প্রকৃতি আর ক্রিকেটের মেলবন্ধন
টিলার গ্যালারির উপরে বাঁশঝাড় আরও ঘন হয়েছে, অন্যপাশে ঝুলে থাকা কাঁঠালগুলো দূর থেকেই লোভ জাগায়। সিলেটের এই মাঠে ক্রিকেটের সঙ্গে প্রকৃতিও সমানতালে গল্প বলে। টেস্টের দ্বিতীয় দিনের প্রথম সকালটা ছিল ঠিক তেমনই মায়াময়। ফুরফুরে বাতাসে ভেসে আসছিল গ্যালারির কোলাহল, আর মাঠে তখন তাসকিন আহমেদ ও মেহেদী হাসান মিরাজের আগুনঝরা বোলিংয়ে চাপে ছিল পাকিস্তান। ম্যাচের পরিস্থিতি তখন পুরোপুরি বাংলাদেশের পক্ষে।
সাংবাদিকদের খুনসুঁটি
সেই আবহেই সাংবাদিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে খুনসুঁটির আমেজ। দূর থেকে লিটন দাসের স্লেজিংয়ের ঢঙ নকল করে এক সাংবাদিক হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন: 'খেয়ে দে তাসকিন! বাবর আজমের রেপুটেশন ভালো না!' মুহূর্তেই আশপাশে হাসির রোল পড়ে যায়। সিলেটের সবুজে ঘেরা সেই সকাল যেন তখন শুধু ক্রিকেট নয়, আনন্দ, রসিকতা আর প্রাণখোলা উচ্ছ্বাসেরও এক অনন্য ছবি হয়ে ওঠে।
প্রেসবক্স থেকে গ্যালারি
প্রেসবক্স থেকে গ্যালারির দিকে নামতেই ফটোসাংবাদিকরা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন পরিচিত মুখগুলো ক্যামেরাবন্দি করতে। একটু নিরিবিলি বসার জায়গা খুঁজে নেওয়ার আগেই কয়েকজন পুলিশ সদস্য এগিয়ে এলেন। বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইলেন, 'আসলে আপনারা কারা? বাউন্ডারির উপরে ওঠা নিষেধ।' এক সাংবাদিক হেসে বুঝিয়ে বললেন, নিষেধাজ্ঞাটা মূলত আমাদের জন্য নয়। গ্রিন গ্যালারির পরিচর্যা খুব নিয়মিত হয় না; দ্বিতীয় ধাপ থেকেই জায়গাটা বেশ খাড়া হয়ে গেছে, সামান্য অসতর্ক হলেই নিচে গড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। সেই সতর্কতা থেকেই বাউন্ডারি টেনে দেওয়া হয়েছে।
ভুলু চন্দ্র ঘোষের চা
এর মধ্যেই মাঠের চেনা প্রাণ ভুলু চন্দ্র ঘোষ দৌড়ে এসে হাজির হলেন চায়ের ফ্লাস্ক হাতে। তার চা না খেয়ে উপায় নেই; শুধু হাতে নিলেই হবে না, চুমুক দিয়ে ভালো বলতেও হবে। এটা অনেকটা রীতি হয়ে গেছে। হাসি-আড্ডার ফাঁকে চলল খানিকটা ফটোসেশনও।
টিলার উপরে প্রকৃতির স্পর্শ
এরপর সবাই উঠে গেলেন টিলার উপরের দিকে। সেখানে পৌঁছাতেই প্রকৃতির নিজস্ব এয়ারকন্ডিশনার মন জুড়িয়ে দিল। প্রবল বাতাস বইছে; গ্রীষ্মকালেও বসন্তের হাওয়ায় ছুঁয়ে যাচ্ছে শরীর। এমন পরিবেশে দাঁড়িয়ে কয়েকজন সাংবাদিকের মনে পড়ে গেল বিদেশের নানান ক্রিকেট ভেন্যুর কথা: সেন্ট ভিনসেন্টের কিংসটাউন, নিউজিল্যান্ডের নেলসন কিংবা অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড। কী দারুণভাবে তারা প্রাকৃতিক গ্যালারিগুলোকে দর্শকদের জন্য সাজিয়ে তোলে, আয়োজন আর সুযোগ-সুবিধায় অনন্য করে রাখে! কেউ কেউ যেন চোখের সামনেই সেই ছবিগুলো কল্পনা করতে লাগলেন।
প্রশ্ন: কেন নয় সিলেট?
অথচ সিলেটেও এখন নিয়মিত সব ধরনের ক্রিকেট আয়োজন হয়। ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি ম্যাচই হয় এখানে। তাহলে এই গ্রিন গ্যালারিটা কেন আরও সুন্দরভাবে গড়ে উঠবে না? প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই ঘুরপাক খেতে লাগল সবার মনে।
মাঠের উত্তেজনা
তখনও মেঘলা আকাশে সূর্যের দেখা নেই, তাই দিনের আলোয়ও জ্বালানো হয়েছে ফ্লাডলাইট। বড় রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তান এরই মধ্যে চার উইকেট হারিয়ে বিপদে। সেই আবহেই সাংবাদিকদের ভেতরে হঠাৎ দর্শকসুলভ উচ্ছ্বাস জেগে উঠল। চারপাশ এতটাই নিরিবিলি যে একটু জোরে কথা বললেই মাঠের অন্যপ্রান্ত থেকেও শোনা যায়। ক্রিজে তখন বাবর আজম ও সালমান আগা।
এক সাংবাদিক হঠাৎ গলা চড়িয়ে বলে উঠলেন: 'খেয়ে দে তাসকিন, বাবরকে খেয়ে দে!' এরপর আরেকজন নকল করলেন লিটন দাসের স্লেজিংয়ের ঢঙ; আরও জোরে চিৎকার করে বললেন: 'বাবরের রেপুটেশন ভালো না, খেয়ে দে!' মাঠে থাকা মুশফিকুর রহিম আর নাজমুল হোসেন শান্তও যেন দূর থেকে সেই আওয়াজ টের পেলেন; একটু কাছেই থাকা শরীফুল ইসলাম ফিরে তাকিয়ে মুচকি হেসে দিলেন।
টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্য বোধহয় এমনই: সাদার ভেতরেও রঙিন আবেগ থাকে, স্লেজিংয়ের ভেতরেও থাকে রোমাঞ্চ, আর প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশে যায় নির্মল বিনোদন।



