নাহিদ রানার বোল্ড আউট: ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে চিরস্থায়ী হয়ে থাকা এক মুহূর্ত
নাহিদ রানার বোল্ড আউট: চিরস্থায়ী মুহূর্ত

নাহিদ রানার বোল্ড আউট দেখে নিশ্চয়ই মন ভরেনি? বারবার দেখতে ইচ্ছা করে? যেতে পারেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ফেসবুক পেজে। সেখানে আউটটির দুই রকম ভিডিও আছে। একটি রিয়েল–টাইম, অন্যটি স্লো মোশন। দুটি ভিডিও দেখে সিনেমার বিশেষ মুহূর্তও মনে পড়তে পারে।

ওই যে, নায়কের অ্যাকশন দৃশ্যে যেটা হয়—প্রথমে রিয়েল–টাইমে দেখার পর একই দৃশ্যের স্লো মোশন ভিডিও, সঙ্গে আবহসংগীত। নারী কণ্ঠের সে আবহসংগীতের সঙ্গে স্টাম্প ভাঙার দৃশ্যটি দেখেও মনে পড়তে পারে ‘গ্ল্যাডিয়েটর’ কিংবা ‘ব্রেভ হার্ট’—নেটিজেনদের ভাষায় যেটা ‘অ্যাবসুলেট সিনেমা’!

সিনেমা-কাব্য ছেড়ে বাস্তবে ফিরতে হয়। কিন্তু সেটাও একটু কঠিন কাজ। সামান্য একটা বোল্ডআউট গতকাল থেকেই ভাইরাল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললে এখনো সামনে চলে আসছে বারবার। হয়তো আজ, আগামীকাল কিংবা পরশুর পর আর আসবে না। কিন্তু মনের মুকুরে থেকে যাবে। সম্ভবত ওভাবে অন্য যেকোনো আউটের চেয়ে গতকালের আউটটি মানুষের মনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তও করে নিয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কেন বলুন তো? ব্যাটসম্যান দেখেশুনে ছাড়লেন, কিন্তু বলটি বিশ্বাসঘাতকতার খেলা খেলে ভেঙে দিল স্টাম্প—বাংলাদেশ ক্রিকেটে এই দৃশ্য নিয়মিত না হলেও আগেও তো দেখা গেছে। ওয়াসিম জাফরের সেই আউট নিশ্চয়ই মনে আছে?

তাহলে গতকালের সেই বোল্ডআউটের এমন বিশেষ কী মাহাত্ম্য যে বাংলাদেশের জয় নিয়ে যতটা আলোচনা চলছে, তার চেয়ে বেশি কথা হচ্ছে আউটটি নিয়ে। ওহ্‌, বলতে বলতে বলাই হয়নি, অবশ্য না বললেও চলে; বোলারের নামটি নাহিদ রানা, ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ রিজওয়ান। বাকিটা সবার জানা।

আউটের ধরনে লুকিয়ে স্মৃতি টিকে থাকার স্থায়িত্ব

আসলে আউটের ধরনে লুকিয়ে আউটটির স্মৃতি টিকে থাকার স্থায়িত্ব। ২৫-৩০ বছর পেছনে ফিরতে হয়। বাংলাদেশের ক্রিকেট তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হাঁটি হাঁটি পা পা করছে আর পাকিস্তানি ফাস্ট বোলারদের চলছে সোনালি সময়—ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস ও শোয়েব আখতার। ব্যাটসম্যানদের কাঁপাকাঁপি অবস্থা!

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শুধু পাকিস্তানি ফাস্ট বোলারদের নাম নিলে বাকিদের প্রতি একটু অন্যায় করা হয়। অস্ট্রেলিয়ার ব্রেট লি, নিউজিল্যান্ডের শেন বন্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার ন্যান্টে হেওয়ার্ডরাও গতির ঝড় তুলতেন। তখন টিভিতে এসব ফাস্ট বোলারের বলে কেউ ছাড়তে গিয়ে বোল্ড হলে ভীষণ রোমাঞ্চিত হয়ে উঠতেন সবাই। পাশাপাশি আক্ষেপের সুরে একটি আশাও সুনীলের সেই লাইনের মতো, ‘দেখিস, একদিন আমরাও...।’

তখন বাংলাদেশেরও পেসার ছিল, কিন্তু ফাস্ট বোলার ছিল না। সবার সামর্থ্যের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলা যায়, তাঁদের কারও বল অফ স্টাম্পের ইঞ্চিখানেক বাইরে পড়লে এবং ব্যাটসম্যান ছাড়ার জন্য সামনে পা বাড়িয়ে ব্যাট তুলে ধরলে সম্ভবত কেউই আশা করতেন না, বলটা শাঁই করে ঢুকে স্টাম্পে আঘাত হানবে। কারণ? কারও কারও সুইং থাকলেও ওই জায়গা (বল পিচ করার পর) থেকে বোকা বানানোর মতো ভয়ংকর গতি ছিল না। সে কারণে দেখা যেত, শুধু গতি কম থাকায় বল হয়তো স্টাম্পে ঢোকার মুহূর্তে ব্যাটসম্যান নিজের ভুল বুঝতে পেরে পজিশন পাল্টে ব্যাটে খেলার মতো সময় পেতেন।

মাশরাফির পর নাহিদের আগমন

দৃশ্যটা একটু পাল্টে গেল মাশরাফি বিন মর্তুজা নামের এক ধূমকেতুর আবির্ভাবের পর। ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম টেস্টে ভারতের প্রথম ইনিংসে প্রথম বলে জাফরও বোকা বনে যান রিজওয়ানের মতোই। সামনে পা নিয়ে ছাড়লেও মাশরাফির ১৩৩.৭ কিলোমিটার গতির বলটি শাঁই করে ঢুকে পড়ে স্টাম্পে। বোল্ড!

পরে সেই আউট নিয়ে কাব্য থেকে আশার নকশিকাঁথা কম বোনা হয়নি। পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের সামর্থ্য বিচারে সেটা অযৌক্তিক কিছুও ছিল না। কিন্তু টিভিতে আরও গতিময় পেসারদের বোলিং দেখে সবারই একটু ঈর্ষা হতো। এ ব্যাপারটি কেউ সম্ভবত অস্বীকার করতে পারবেন না। যেমন ধরুন, ওয়াকার ইউনিস একইভাবে কাউকে বোল্ড করলে দেখতে যত রোমাঞ্চ জাগত, সেটা আমাদের পেসারদের বলে ততটা হতো না। কারণ একটাই—গতি। ক্রিকেটে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য সম্ভবত ফাস্ট বোলারের বুলেটগতির বল; ব্যাটসম্যান ছাড়েন কিংবা খেলেন, বোল্ড হন কিংবা ড্রাইভ খেলেন—ফাস্ট বোলারের প্রতিটি বলই আসলে একেকটি ইভেন্ট।

সেসব ইভেন্ট দেখতে ওয়াকার, ওয়াসিম কিংবা শোয়েবের বোলিং ছিল চূড়ান্ত ব্যাপারস্যাপার। রানআপ থেকে শুরু করে বল কিপারের গ্লাভসে পৌঁছানো পর্যন্ত সব চোখে চেটেপুটে নিতেন দর্শক। আর ব্যাটসম্যান ছাড়তে গিয়ে বোল্ড হলে তো কথাই নেই। বিশেষ করে ফিট ওয়াকার কিংবা শোয়েবের বলে; কারণ, ওয়াসিমের বৈচিত্র্য বেশি থাকলেও তাঁর বলে বাকি দুজনের চেয়ে গতি একটু কম ছিল।

আরও একটি বিশেষ ব্যাপার ছিল। ধরুন, বল একটু পুরোনো; সেই বলে ওয়াকার কিংবা শোয়েবের রিভার্স সুইং যখন ব্যাটসম্যান বুঝতে না পেরে ছাড়তেন এবং বলটা সাপের ছোবল মেরে শাঁই করে ঢুকে স্টাম্প ভেঙে দিত, সেটা দেখার যে আনন্দ, তা আসলে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যেমন নাহিদ রানার গতকালের বলটি; সেটা কি শুধুই একটি ডেলিভারি, নাকি একটি বিবৃতিও—‘দেখুন, এখন আমরাও পারি!’

নাহিদের ডেলিভারির বিশ্লেষণ

নাহিদ ক্রিজের (সাইড নো দাগের পাশ থেকে) একদম কোনা থেকে বলটি ছেড়েছিলেন। তাতে ডানহাতি রিজওয়ান এবং তাঁর দূরত্বের মাঝে কল্পিত একটি অ্যাঙ্গেলও তৈরি হয়। এমনিতে দেখে মনে হয়, অ্যাঙ্গেলের কারণেই বলটা বুঝি পিচ করে একটু ঢুকে রিজওয়ানের স্টাম্পের বেলস ভেঙেছে!

আরেকটু মনোযোগ দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, বলটা একটু রিভার্স সুইং করেছে। নাহিদ বলটি হাত থেকে ছাড়ার সময় যে গতিপথ ছিল, ছাড়ার পর সেটা সামনের এক হাত দূরত্বের মধ্যে গতিপথ পাল্টাতে পাল্টাতে পিচ করে আরও ভেতরে ঢুকেছে। দয়া করে ১৪৭.২ কিলোমিটার গতির ব্যাপারটিও ভুলবেন না। রিভার্স সুইংয়ে ওটাই আসল অস্ত্র আর এ গতির কারণেই রিজওয়ান ভুল শোধরানোর সময় পাননি।

রিজওয়ান সামনে পা নিয়ে বলটা ছাড়তে দুই হাতে ব্যাট উঁচু করেন। বল পিচ করে ভেতরে ঢোকার সময় অবশ্যই টের পেয়েছেন, সিদ্ধান্তটি ভুল। কিন্তু বলের ভীষণ গতির কারণে তখন আর কিছু করার ছিল না।

পাল্টা যুক্তি হতে পারে, তাহলে বল শরীরের খুব কাছাকাছি যেতেই রিজওয়ান কোমরটা ব্যালে ড্যান্সারদের মতো সরিয়ে নিলেন কেন? রিজওয়ানের আশা ছিল, বল হয়তো স্টাম্পের ওপর দিয়ে চলে যাবে। সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ের মধ্যে এই যে ‘জাজমেন্ট’ করতে হয় ব্যাটসম্যানকে, সেটাকে আরও সংকুচিত করে ফেলে ফাস্ট বোলারের গতিময় ডেলিভারি। এ কারণে সেই সময়ে বাংলাদেশের পেসারদের বল ছাড়তে গিয়ে সিদ্ধান্ত ভুল মনে হলে তৎক্ষণাৎ ঠিক করে নেওয়ার সময় পেত প্রতিপক্ষ। তাসকিনরা আসার পর সেই সুযোগ আর নেই। নাহিদ ‘আগুন’ রানা আসার পর এটা ভাবাও ভুল।

রিজওয়ানের ভুলটি বলটি খেলার আগে শুরুর এই ভাবনাতেই। তাতে চাইলে কল্পিত এক মজার দৃশ্যও মনে মনে এঁকে নিতে পারেন। ধরুন, বাসে প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে হ্যান্ডল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। ঠাসাঠাসির মধ্যে লোকজনের যাতায়াতের জন্য আমরা জায়গা করে দিই কীভাবে? ওপরের হ্যান্ডল ধরা থাকা অবস্থায়ই কোমরটা আগু-পিছু করে জায়গা বানাতে হয়। এবার রিজওয়ানের আউটটি মনে করুন। ব্যাট ওপরে রেখে রিজওয়ান যেভাবে কোমরটা পেছনে নিয়ে বলের পথ করে দিলেন, সেটা লোকাল বাসে প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে হ্যান্ডল ধরে থাকা অসহায় সেই যাত্রীর মতোই। যদিও ক্রিকেটীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বল ছাড়তে গিয়ে এটা ছাড়া আর কিছু করারও নেই। তবু যখন আউট হতে হয়, তখন প্রতিপক্ষের স্তুতি গাওয়া ছাড়া আর কীই-বা করা থাকে!

প্রতিক্রিয়া ও তাৎপর্য

বাসিত আলীও ঠিক সেটাই করেছেন। বাংলাদেশের পেসারদের বোলিং, বিশেষ করে নাহিদকে দেখে তাঁর উপলব্ধিটা যে কাউকে সন্তুষ্ট করবে, ‘শান্ত ম্যাচসেরা হলেও আমার ম্যাচসেরা নাহিদ। সে আমাকে পাকিস্তানের পুরোনো ফাস্ট বোলিং মনে করিয়ে দিয়েছে। ওয়াসিম, ওয়াকার, শোয়েবকে মনে পড়েছে...সে রান দেবে, কিন্তু উইকেটও সে-ই নেবে।’

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রিকেটের শুরুর দিনগুলো থেকে যাঁরা ম্যাচের পর ম্যাচ দেখে আসছেন, তাঁদের জন্য পাকিস্তানের সাবেক ব্যাটসম্যানের এ কথাটা কত বড় প্রাপ্তি, তা আসলে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। শুধু অনুভবই করা যায়। বছরের পর বছর অন্য দলের ফাস্ট বোলারদের এমন সব কীর্তি দেখতে হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের আর শুনতে হয়েছে, বাংলাদেশ পেসার নয়, স্পিন-প্রসবা। এখন? ফাস্ট বোলার–প্রসবা পাকিস্তানের এক কীর্তিমান এখন বাংলাদেশি এক ফাস্ট বোলারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সত্যিই দিন এক রকম থাকে না, দিন বদলায়।