মোহামেডানের স্ট্রাইকার সৌরভ দেওয়ানের জন্য গত দুই মৌসুম ছিল এক নীরব যন্ত্রণার। মাঠের সবুজ ঘাসের চেয়ে বেঞ্চের প্লাস্টিক চেয়ারই যেন তাঁর বেশি আপন হয়ে উঠেছিল। দর্শকেরা যখন মোহামেডানের গোলের জন্য চিৎকার করতেন, তখন সৌরভের দুই চোখে ফুটত অসহ্য এক নীরব অপেক্ষা—কখন আসবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ? কখন কোচ ইশারায় বলবেন, ‘সৌরভ, নামো!’
বুকভরা স্বপ্ন আর নিয়তির পরীক্ষা
২০২৩-২৪ মৌসুমে যখন বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে সাদা-কালো শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন সৌরভ, তখন হয়তো ভাবেননি, নিয়তি তাঁর এতটা পরীক্ষা নেবে। প্রথম মৌসুমে সুযোগ পেলেন মাত্র ৫ ম্যাচে। পরের মৌসুমে সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়াল সাতে। কিন্তু একজন জাত স্ট্রাইকারের তৃষ্ণা কি আর ৫-৭ ম্যাচ কিংবা ১০-২০ মিনিটের ‘ক্যামিও’তে মেটে? অধিকাংশ সময় তাঁকে ৯০ মিনিট কাটিয়ে দিতে হয়েছে ডাগআউটে সতীর্থদের উল্লাস দেখে।
সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও সৌরভের কণ্ঠে বিষাদ ঝরে, ‘মানসিকভাবে অনেক ভেঙে পড়েছিলাম। গত সিজনেও ফেডারেশন কাপে গোল ছিল, লিগেও গোল ছিল। তবুও গেম টাইম পাচ্ছিলাম না। অনুশীলনে মানসিকতা ঠিক রাখা খুব কঠিন হয়ে পড়েছিল। ভাবছিলাম ক্লাব ছেড়েই দেব।’
নতুন কোচের আগমনে পাল্টানো ভাগ্য
অন্ধকার মানেই আলো ফোটার অপেক্ষা। কোচ বদলাল মোহামেডান, ডাগআউটে এলেন আবদুল কাইয়ুম। নতুন কোচ এসেই যেন পাকা জহুরির মতো রত্ন চিনলেন। বেঞ্চে পড়ে থাকা সেই সৌরভ নামের ‘রত্ন’কে নামালেন মাঠে। কোচের আস্থার প্রতিদান দিতেও সময় নেয়নি টাঙ্গাইলের ছেলেটি।
মৌসুমের শুরুতে মোহামেডান ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবলেও সেই সৌরভই এখন ফেডারেশন কাপে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। নামের পাশে ৩ ম্যাচে ৬ গোল। কেবল গোল করাই নয়, নেইমারের স্টাইলে তাঁর উদ্যাপন এখন মোহামেডান সমর্থকদের চোখের প্রশান্তি।
বাবার স্বপ্ন আর নিজের জেদ
সৌরভের ফুটবলে আসার শুরুটা হয়েছিল বাবার হাত ধরে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা বুট কিনে দিয়ে মাঠে নিয়ে যেতেন। বাবার স্বপ্ন আর নিজের হার না–মানা জেদের কারণেই সৌরভ আজ এখানে। আগামী ১৯ মে কিংসের বিপক্ষে ফেডারেশন কাপের ফাইনাল। সামনে হাতছানি দিচ্ছে শিরোপা আর ৯ গোল করা দরিয়েলতনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ।
সৌরভ এখন আর ব্রাত্য নন। সৌরভ এখন সাদা-কালো শিবিরের আস্থার প্রতীক। ডাগআউটের নিঃসঙ্গ প্রহরগুলো তাঁকে শিখিয়েছে—ধৈর্য ধরলে আর নিজের ওপর বিশ্বাস রাখলে সাফল্যের খেলার ‘সৌরভ’ একদিন সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়বেই।



