মানুষ কেন মারপিট ও লড়াই দেখতে এত পছন্দ করে? বিজ্ঞান কী বলে?
রাস্তায় কোথাও মারামারি লাগলে দেখা যায়, অনেক মানুষ গোল হয়ে দাঁড়িয়ে তা দেখছে। আবার বক্সিং বা ইউএফসির মতো মারপিটের খেলাগুলোর জনপ্রিয়তাও বিশ্বজুড়ে ব্যাপক। কিন্তু কেন আমরা অন্য মানুষের মারপিট বা লড়াই দেখতে এত পছন্দ করি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য উন্মোচন করেছেন।
আদিম যুগের লড়াইয়ের জিনগত প্রভাব
আদিম যুগে টিকে থাকার জন্য মানুষকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হতো। সেই সময়কার লড়াই করার প্রয়োজনীয়তা ও টিকে থাকার কৌশলগুলোই আজ আমাদের বিনোদন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ সেই সময় থেকে বিভিন্ন কাজে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আসছে। বর্শা নিক্ষেপ, ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ, বক্সিং বা কুস্তি—এসবই ছিল সেই প্রতিযোগিতার অংশ।
বংশপরম্পরায় টিকে থাকার লড়াইয়ের দিক থেকে দেখলে বিষয়টি বেশ যৌক্তিক। কারণ, যারা এসব দক্ষতা ভালোভাবে শিখত, বাস্তব জীবনের কোনো বিপদে বা লড়াইয়ে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি থাকত। এই টিকে থাকার গুণগুলোই যুগ যুগ ধরে মানুষের মধ্যে চলে এসেছে।
সেনসেশন সিকিং: নতুন তীব্র অভিজ্ঞতার আকাঙ্ক্ষা
বক্সিং বা কুস্তির মতো লড়াইয়ের খেলা দেখা মূলত সেই পুরোনো অভ্যাসেরই একটি অংশ। এ ধরনের খেলা দেখার সময় আমরা ঠিক লড়াইয়ের মতোই উত্তেজনা বা রোমাঞ্চ অনুভব করি। কিন্তু এখানে আমাদের নিজেদের কোনো শারীরিক বিপদের ঝুঁকি থাকে না। সহজ কথায়, নিজের কোনো ক্ষতি না করেই লড়াইয়ের উত্তেজনা উপভোগ করার জন্যই মানুষ এসব খেলার প্রতি আকৃষ্ট হয়।
অবশ্যই সবার ক্ষেত্রে লড়াই দেখার আগ্রহ এক রকম হয় না। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ অন্যদের চেয়ে এই ধরনের উত্তেজনা বেশি পছন্দ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটনে কয়েক শ স্নাতক শিক্ষার্থীর ওপর একটি গবেষণা করা হয়েছিল। সেই গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মানুষের ব্যক্তিত্বে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বেশি এবং যাঁরা ভয়ের অনুভূতি উপভোগ করেন, তাঁরাই মিক্সড মার্শাল আর্টস বা এমএমএ দেখে বেশি আনন্দ পান। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘সেনসেশন সিকিং’ বা নতুন কোনো তীব্র অভিজ্ঞতা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
নাটকীয়তা ও শারীরিক ঝুঁকির আকর্ষণ
তবে সব দর্শক যে কেবল মারামারি বা সহিংসতার জন্যই লড়াই দেখতে পছন্দ করেন, তা নয়। অপেশাদার এমএমএ লড়াইয়ের দর্শকদের ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, লড়াইয়ের ভেতরের নাটকীয়তা তাদের কাছে একটি বড় আকর্ষণ। অন্য অনেক খেলাধুলায় হারজিত থাকলেও সেখানে বড় কোনো শারীরিক ঝুঁকি থাকে না। কিন্তু একজন কুস্তিগির বা বক্সার যখন লড়েন, তখন তিনি আক্ষরিক অর্থেই নিজের শরীর ও কখনো কখনো জীবন বাজি রেখে লড়েন।
একজন দর্শকের কাছে এই ঝুঁকির মাত্রা যত বেশি হয়, লড়াইয়ের নাটকীয়তাও তত বেশি উত্তেজনার সৃষ্টি করে। এই প্রবল উত্তেজনা দর্শকদের মনের ভেতর খেলার প্রতি একধরনের গভীর টান তৈরি করে।
মস্তিষ্কের রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া: ডোপামিন ও অ্যাড্রেনালিন
যখন আমরা এ ধরনের কোনো মারপিট বা লড়াই দেখি, তখন আমাদের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ ও ‘অ্যাড্রেনালিন’ নামের দুটি রাসায়নিক উপাদান বা হরমোন বেড়ে যায়। ডোপামিন আমাদের মনে একধরনের আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। আর অ্যাড্রেনালিন আমাদের শরীরকে উত্তেজিত ও সজাগ করে তোলে। যাঁরা ঝুঁকি নিতে পছন্দ করেন, তাঁদের মস্তিষ্কে এই হরমোনগুলোর প্রভাব অন্যদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়।
এর ফলে তাঁরা লড়াইয়ের ময়দানে প্রতিটি আঘাত বা আক্রমণ দেখে একধরনের রোমাঞ্চ অনুভব করেন, যা সাধারণ দর্শকদের ক্ষেত্রে হয়তো ভয়ের কারণ হতে পারত।
মিরর নিউরন: অন্যের অভিজ্ঞতা নিজের মধ্যে অনুভব করা
লড়াই দেখার পেছনে আরেকটি মজার কারণ আমাদের মস্তিষ্কের ‘মিরর নিউরন’ বা প্রতিবিম্ব স্নায়ু। এটি অনেকটা আয়নার মতো কাজ করে। আমরা যখন কাউকে লড়তে দেখি, তখন আমাদের মস্তিষ্কের এই বিশেষ স্নায়ুগুলো এমনভাবে কাজ শুরু করে যেন আমরা নিজেরাই সেই লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছি। একে বলা হয় অন্যের অভিজ্ঞতা নিজের মধ্যে অনুভব করা।
এ কারণেই যখন আমাদের প্রিয় কোনো খেলোয়াড় লড়াইয়ে জেতেন, তখন আমাদের মনে হয় যেন জয়টি আমাদেরই। এই মানসিক টানের কারণেই মানুষ বারবার লড়াই দেখতে পছন্দ করে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই মনস্তাত্ত্বিক ও জৈবিক কারণগুলোই মানুষকে লড়াই দেখার দিকে আকৃষ্ট করে।



