ধ্বংসস্তূপে আশার আলো: গাজার আশ্রয়শিবিরে বক্সিং প্রশিক্ষণ নিচ্ছে ফিলিস্তিনি কিশোরীরা
গাজার আশ্রয়শিবিরে বক্সিং প্রশিক্ষণ নিচ্ছে ফিলিস্তিনি কিশোরীরা

ধ্বংসস্তূপের মাঝে বক্সিং রিং: গাজায় ফিলিস্তিনি কিশোরীদের অনন্য সংগ্রাম

ইসরায়েলের নৃশংস হামলায় বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা। লাখ লাখ মানুষ সহায়-সম্বল হারিয়ে আশ্রয়শিবিরে জীবনযাপন করছেন। এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও আশার একটি আলো জ্বলছে দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে। সেখানে আশ্রয়শিবিরের তাঁবুর মাঝে, বালুর ওপর কাঠ দিয়ে তৈরি একটি বক্সিং রিং। গত সোমবার সেখানে লড়াইয়ে নামার আগে অপেক্ষায় ছিলেন কয়েকজন ফিলিস্তিনি কিশোরী।

মানসিক আঘাত কাটাতেই বক্সিংয়ের আশ্রয়

ইসরায়েলি হামলার তীব্র মানসিক আঘাত কাটাতেই এই বক্সিং রিংয়ে সমবেত হয়েছেন কিশোরীরা। তাদের অনেকেই পরিবার বা প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। সংঘাত ও বোমাবর্ষণের ভয়াবহ প্রভাব এই মেয়েদের মনোজগতে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। বক্সিং হয়ে উঠেছে তাদের আবেগ প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

এই অনন্য উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন প্রশিক্ষক ওসামা আইয়ুব। আগে উত্তরে গাজা নগরীতে তাঁর একটি বক্সিং ক্লাব ছিল। কিন্তু ইসরায়েলি হামলায় বাড়িসহ ক্লাবটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। পালিয়ে খান ইউনিসে আসার পর তিনি নতুন উদ্যমে বক্সিং প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছেন। ওসামার মতো এখানে যেসব কিশোরী বক্সিং শেখে, তারাও বাস্তুচ্যুত।

প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়তে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ওসামা

ছোট পরিসরে হলেও নিজের বক্সিং প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি গড়ে তুলতে ওসামাকে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজায় হাতের কাছে যা পেয়েছেন, তা দিয়েই কাজ সেরেছেন তিনি। বক্সিং রিংটি তৈরি করা হয়েছে কাঠ দিয়ে। রিংয়ে কোনো ম্যাট বা পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। তাই খুদে বক্সারদের পাশে দাঁড়াতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

ওসামা সপ্তাহে তিন দিন এই কিশোরীদের বক্সিং শেখান। বিনিময়ে তিনি কোনো অর্থ গ্রহণ করেন না। তাঁর ভাষায়, "সংঘাত ও বোমাবর্ষণের প্রভাব এই মেয়েগুলোর ওপর পড়েছে। কেউ কেউ পরিবার বা প্রিয়জনকে হারিয়েছে। তাদের মনের ভেতরে কষ্ট রয়েছে। এ থেকে তারা মুক্তি চায়। তাই আবেগ প্রকাশের একটি উপায় হিসেবে বক্সিংকে বেছে নিয়েছে।"

কিশোরীদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা

এই প্রশিক্ষণকেন্দ্রে অংশ নেওয়া কিশোরীদের বয়স ৮ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। ১৬ বছর বয়সী প্রশিক্ষণার্থী রিমাস সাহায্যের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। বিদেশিরা তাদের জন্য গ্লাভস আর জুতা পাঠাবে—এ আশায় রয়েছে সে। অন্যদিকে ১৪ বছর বয়সী গাজাল রাদওয়ান বক্সিং শিখে বিশ্বমঞ্চে ফিলিস্তিনের প্রতিনিধিত্ব করতে চান।

গাজালের কথায়, "আমি বক্সিং শিখছি নিজেদের চরিত্র গঠনের জন্য। স্বপ্ন দেখি ভবিষ্যতে একজন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার। অন্য দেশের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে লড়াই করার। আমি চাই, পৃথিবীজুড়ে ফিলিস্তিনের পতাকা উড়ুক।"

ধ্বংসস্তূপের মাঝে এই বক্সিং রিং শুধু একটি ক্রীড়া কেন্দ্র নয়, এটি হয়ে উঠেছে প্রতিরোধ ও আশার প্রতীক। ফিলিস্তিনি কিশোরীরা এখানে কেবল বক্সিংই শিখছে না, তারা শিখছে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার দৃঢ়তা।