চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকতে গোসলে নেমে জোয়ারের টানে আবারও ভেসে যাচ্ছিলেন চার পর্যটক। বিষয়টি দেখতে পেয়ে সেখানে দায়িত্বরত গ্রাম পুলিশের দুই সদস্য একটি লাইফবোট নিয়ে তাদের উদ্ধার করেন। গত সোমবার দুপুর ১২টার দিকে ঘটনাটি ঘটলেও বুধবার (৩ জুন) এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এ ঘটনায় ডুবতে থাকা পর্যটকদের নাম–পরিচয় পাওয়া যায়নি।
ঘটনার বিবরণ
উদ্ধারকারী গ্রাম পুলিশ সদস্য নুরুল আমিন জানান, সোমবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে সৈকতে জোয়ার এলে প্রচুর পর্যটক সাগরে গোসলে নামেন। দুপুর ১২টার দিকে হঠাৎ দেখা যায় চার পর্যটক সাঁতার কাটতে কাটতে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের বাইরে চলে গেছেন। সাগরে বড় বড় ঢেউ থাকায় এবং পর্যটকেরা ক্লান্ত হয়ে পড়ায় তারা আর ফিরে আসতে পারছিলেন না। বিষয়টি বুঝতে পেরে আমি ও আমার সহকর্মী সফর আলী মিলে সৈকতে থাকা একটি লাইফবোটের চালককে জোগাড় করে তাদের উদ্ধার করি। নৌকায় তোলার পর ক্লান্ত হয়ে তাঁরা শুয়ে পড়েন।
গ্রাম পুলিশের বক্তব্য
নুরুল আমিন বলেন, ‘আমরা এই এলাকার বাসিন্দা। আমরা বুঝতে পারি, কতটুকু গেলে একজন পর্যটক বিপজ্জনক দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন। ১০–১২ দিন ধরে সেখানে দায়িত্ব পালন করছি। এ সময় দেখছি, পর্যটকেরা স্থানীয় বাসিন্দাদের কথাবার্তা শুনতে চান না। তারা নিজেদের খেয়ালখুশিমতো সাঁতার কাটেন। এতেই বিপত্তি ঘটে। আমরা ইউনিফর্ম পরে তাদের সতর্ক করছি। তবু তারা শুনতে চান না। পরে বাঁশি বাজিয়ে কিংবা চাপ প্রয়োগ করে হোক তাদের তুলতে হয়।’
ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যবহারকারীরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। অনেকেই পর্যটকদের খামখেয়ালিপনাকে দায়ী করলেও, অনেকে আবার গুলিয়াখালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকায় ট্যুরিস্ট পুলিশ কিংবা সরকারি নিরাপত্তা তদারকি ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ফেসবুক মন্তব্যে এস্কান্দর হোসেন নামের একজন লিখেছেন, ‘বড় বড় ঢেউ দেখার পরও যদি মরার জন্য কেউ নেমে ডুবে যায়, সেখানে কাকে দায়ী করা যাবে। কিছু পর্যটক কারও কথা শোনেন না।’ আজমল হোসেন নামের একজন লিখেছেন, ‘সৈকতে পর্যটকেরা গোসল করতে নামবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু তার দেখভালের জন্য ট্যুরিস্ট পুলিশ দরকার। তা ছাড়া কতটুকু পর্যন্ত গেলে বিপজ্জনক, তা চিহ্নিত করা দরকার। আমার জানামতে, গুলিয়াখালীতে এ রকম কিছু নেই।’
পূর্বের ঘটনা
এর আগে গত ২৩ মে বিকেল পাঁচটার দিকে একইভাবে গোসলে নেমে মুহাম্মদ রিফাত হোসেন (১৮) নামের এক তরুণ নিখোঁজ হন। ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা রাত ৯টা পর্যন্ত রিফাতকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। পরদিন নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। নিখোঁজের প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর ঘটনাস্থলের কাছেই উপকূল থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নিহত রিফাতের বাড়ি কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি এলাকায়।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
চার পর্যটক উদ্ধারের ঘটনার পর গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকতকে বিপজ্জনক এলাকা চিহ্নিত করে লাল পতাকা টাঙানো হয়েছে। সোমবার চার পর্যটক ভেসে যাওয়ার ঘটনার কথা জানিয়ে গ্রাম পুলিশ সদস্যরা বিপজ্জনক এলাকা চিহ্নিত করে প্রশাসনকে লাল পতাকা টাঙানোর প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গ্রহণ করে সেখানে লাল পতাকা লাগানোর নির্দেশ দেন। পরে গ্রাম পুলিশের সদস্যরা সেখানে লাল পতাকা টাঙিয়ে দেন। এ ছাড়া বিভিন্ন গাছে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড দেওয়া হয়। সাইনবোর্ডে লেখা হয়, ‘সতর্কবার্তা! লাল পতাকার বাইরে খুব ঝুঁকিপূর্ণ। কেউ লাল পতাকার বাইরে যাবেন না। নির্দেশক্রমে—উপজেলা প্রশাসন।’
প্রশাসনের বক্তব্য
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, সোমবার চার পর্যটক ভেসে যাওয়ার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত নিরাপদ দূরত্বে লাল পতাকা টাঙানো ও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড লাগানোর নির্দেশ দেন। পর্যটকদের সাগরে নামার ক্ষেত্রে গ্রাম পুলিশকে আরও সতর্ক থাকতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।



