ঐতিহ্যের রথযাত্রা: ধামরাইয়ের যশোমাধবের গল্প ও মাসব্যাপী মেলা
ধামরাইয়ের যশোমাধব রথযাত্রা: ইতিহাস ও মেলার গল্প

ধামরাইয়ের যশোমাধব রথযাত্রা: ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন

বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রতি বছর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান উৎসব হিসেবে পালিত হয় শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে আষাঢ় মাসের পুষ্যা নক্ষত্র ও শুক্ল দ্বিতীয়া তিথিতে এই আয়োজন দেখা গেলেও ধামরাইয়ে এটি ভিন্ন নামে পরিচিত—যশোমাধব রথযাত্রা। এই ভিন্ন নামের পেছনে লুকিয়ে আছে লোকশ্রুত গল্প, প্রায় চার শতকের ইতিহাস এবং গাজীপুর অঞ্চলের রাজা যশোপালের (পরবর্তীতে যশোমাধব) স্মৃতি। রথের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে যশোমাধব বিগ্রহ, মাসব্যাপী মেলা এবং এক অনন্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।

রাজার স্বপ্ন ও যশোমাধব বিগ্রহের উৎপত্তি

ধামরাইয়ের কায়েত পাড়া এলাকার বাসিন্দা ও রথযাত্রা আয়োজন কমিটির সহসভাপতি প্রাক্তন শিক্ষক নন্দগোপাল সেনের বর্ণনা অনুযায়ী, অষ্টম শতকের দিকে গাজীপুরের মধুপুর অঞ্চলের শাসক রাজা যশোপাল ছিলেন অত্যন্ত ধর্মভীরু ও প্রজাবৎসল। একদিন তিনি তার বিশাল হাতিবহর নিয়ে ধামরাইয়ের শিমুলিয়া এলাকা দিয়ে যাত্রা করছিলেন। হঠাৎ একটি ঢিবির সামনে গিয়ে হাতিটি থমকে দাঁড়ায় এবং আর এগোতে অস্বীকৃতি জানায়। রাজার নির্দেশে ঢিবি খনন করা হলে গভীরে একটি মন্দির আবিষ্কৃত হয়, যেখানে সদ্য পূজিত হওয়ার চিহ্ন ছিল—আগরবাতির গন্ধ, প্রদীপের শিখা, টাটকা ফুল ও বেলপাতা।

এই ঘটনায় বিস্মিত রাজা তন্দ্রাচ্ছন্ন হলে স্বপ্নে মাধব দেবতাকে দেখতে পান। দেবতা তাকে নির্দেশ দেন, “আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাও এবং আমার নামের আগে তোমার যশো নাম যুক্ত কর।” এভাবেই জন্ম নেয় যশোমাধব নামটি। দেবতা আরও বলেন, জৌলুসপূর্ণ পূজার প্রয়োজন নেই; ৮ সম্ভারের ডাল ও কামরাঙ্গার টক দিয়ে ভোগ দিলেই যথেষ্ট। মাটির ঢিবি থেকে উদ্ধার পাওয়া বিগ্রহটি প্রথমে ঠাকুরবাড়ি পঞ্চাশ (বর্তমান ইসলামপুর) এলাকায় স্থাপন করা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন ও বিগ্রহের যাত্রা

হিন্দু শাসকদের পর মুঘল শাসনামলে এই অঞ্চলে পরিবর্তন আসে। ধামরাইয়ের বর্তমান কায়েতপাড়া এলাকার জগজীবন রায় ঠাকুরবাড়ি পঞ্চাশ থেকে যশোমাধব বিগ্রহটি যৌতুক হিসেবে পান এবং তা প্রতিষ্ঠা করেন তার বাড়ির কাছে, যা এখন মাধববাড়ি এলাকা নামে পরিচিত। নন্দগোপাল সেন উল্লেখ করেন, মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পক্ষে এই বিগ্রহের অনুকূলে একটি তৌজি দান করা হয়, যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট এলাকার রাজস্ব আয় মাধবের নামে দেওয়া হতো। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে মামলার পর রায় হয় যে বছরে ২৬ দিন ধামরাই পৌর অঞ্চলের সব রাজস্ব আয় মাধবের নামে গ্রহণ করা হবে। বর্তমানে রথযাত্রার সময় ২০ দিন এবং উত্থান একাদশী মেলা ও মাঘিপূর্ণিমার সময় তিন দিন করে ছয় দিন এই নিয়ম প্রযোজ্য থাকে।

রথযাত্রার ইতিহাস ও নির্মাণকাহিনি

যশোমাধব রথযাত্রা ভারতের পুরির জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার অনুরূপ বলে ধরা হয়। জনশ্রুতি রয়েছে, জগন্নাথ দেবের মূর্তি তৈরির পর অবশিষ্ট কাঠ দিয়ে ধামরাইয়ে জগন্নাথ দেবের মূর্তি তৈরি করা হয়েছিল। বাংলা ১০৭৯ সালে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার পর ১২০৪ সন পর্যন্ত ১২৫ বছর রথযাত্রা চলেছে। এরপর বালিয়াটি জমিদার বাড়ির তত্ত্বাবধানে ১৪৬ বছর এই আয়োজন চলে। শুরুতে বাঁশ দিয়ে তৈরি রথ ব্যবহার করা হতো, পরে বালিয়াটি জমিদাররা এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম কারুকার্যমণ্ডিত রথ নির্মাণ করেন।

দেশভাগের পর জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে মির্জাপুরের দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা রথের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী তাকে পুত্রসহ তুলে নিয়ে যায় এবং রথটি পুড়িয়ে দেয়। এরপর কয়েক বছর বাঁশের রথ ব্যবহার করা হয়। ২০১৩ সালে ভারতের সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে নতুন রথ নির্মাণ করা হয়, যা এখনও ধামরাইয়ের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।

মাসব্যাপী মেলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

ধামরাইয়ের রথযাত্রা কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি প্রাচীন জনমিলনের আয়োজন। রথের দিন থেকে শুরু করে প্রায় এক মাস ধরে চলে মেলা, যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, খাবার ও নানা জিনিসপত্রের পসরা সাজানো হয়। প্রবীণ বাসিন্দা পঞ্চনন্দ ঘোষের ভাষায়, একসময় নদীতে নৌকার সারি, সার্কাস, পুতুলনাচ ও ঢাকঢোলের মাধ্যমে মেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত থাকতো।

স্থানীয় শিক্ষক দেবাশীস রায়ের মতে, রথযাত্রার বিশেষত্ব হলো দেবতা স্বয়ং রথে চড়ে ভক্তদের দেখতে আসেন, যা সব বয়সী মানুষকে আকর্ষণ করে। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের ধামরাই শাখার সভাপতি নাহিদ মিয়া বলেন, “রথ ও মেলা ঘিরে বিপুল সংখ্যক মানুষের আয়-রোজগার হয় এবং এটি বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। সব ধর্মের মানুষই এই উৎসবে অংশ নিয়ে সহযোগিতা করে।”

ধামরাইয়ের যশোমাধব রথযাত্রা তাই শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির মেলবন্ধন, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে আছে মানুষের হৃদয়ে।