পার্বত্য অঞ্চলে সাংগ্রাই উৎসবে মেতে উঠল মারমা সম্প্রদায়
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ ও বর্ষবিদায়ের উৎসব সাংগ্রাই উপলক্ষে খাগড়াছড়ি জেলা শহরের পানখাইয়া পাড়ায় আজ মঙ্গলবার আয়োজিত হলো মৈত্রী পানিবর্ষণ উৎসব। মারমা সম্প্রদায়ের মানুষজন মৈত্রীর বন্ধন সুদৃঢ় করতে পানি নিয়ে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেন, যা এলাকাকে করে তোলে উৎসবমুখর।
মৈত্রী পানিবর্ষণে অংশগ্রহণ ও শোভাযাত্রা
আজ সকালে পানখাইয়া পাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মারমা গানের তালে তালে নেচে-গেয়ে মেতে উঠেছেন নানা বয়সী মানুষ। মাইকে বাজানো মারমা সংগীতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তরুণ-তরুণীরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে এক পক্ষ অপর পক্ষের দিকে পানি ছিটাচ্ছেন, যা মৈত্রী ও সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
সাংগ্রাই উপলক্ষে মারমা সম্প্রদায়ের একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়, যা পানখাইয়া পাড়া মারমা উন্নয়ন সংসদের মাঠ থেকে শুরু হয়ে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার একই স্থানে এসে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় মারমা নারী-পুরুষেরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে অংশগ্রহণ করেন, যা সংস্কৃতির জীবন্ত প্রদর্শনী হিসেবে বিবেচিত হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি
সকালে সেনাবাহিনীর খাগড়াছড়ি রিজিয়নের কমান্ডার এ কে এম ওবায়দুল হক উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এর আগে নববর্ষ উপলক্ষে একই মঞ্চে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে শোভাযাত্রার উদ্বোধন করা হয়, যেখানে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা প্রধান অতিথি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মারমা উন্নয়ন সংসদের সভাপতি মংপ্রু চৌধুরী, যিনি মারমা সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় এই আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
পার্বত্য অঞ্চলের অন্যান্য সম্প্রদায়ের উৎসব
মারমারা ‘সাংগ্রাই’ নামে এই উৎসব উদযাপন করলেও, পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য সম্প্রদায়ও তাদের নিজস্ব নামে বর্ষবরণ ও বর্ষবিদায়ের উৎসব পালন করেন। ত্রিপুরা সম্প্রদায় ‘বৈসুক’, চাকমারা ‘বিজু’, তঞ্চঙ্গ্যারা ‘বিষু’, অহমিয়ারা ‘বিহু’ এবং চাক, ম্রো, বম, খুমিরা ‘চাংক্রান’ নামে এই উৎসবগুলো উদযাপন করে থাকেন, যা অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের পরিচয় বহন করে।
রাঙামাটিতে বাংলা নববর্ষের আয়োজন
এদিকে, রাঙামাটিতেও উৎসবমুখর পরিবেশে পাহাড়ের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বর্ষবরণ ও বর্ষবিদায়ের উৎসব চলছে। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আজ সকাল আটটায় রাঙামাটি পৌরসভা প্রাঙ্গণ থেকে একটি শোভাযাত্রা বের করা হয়, যা জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে এসে শেষ হয়। পরে বেলুন উড়িয়ে সেখানে লোকজ মেলার উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী।
আজ সকাল নয়টায় রাঙামাটির রাজবন বিহারের মাঠ প্রাঙ্গণে বর্ষবরণ উপলক্ষে বিশেষ ধর্মীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে নতুন বছরে সুখ ও সমৃদ্ধি কামনা করে প্রার্থনা করা হয়। অনুষ্ঠানে পঞ্চশীল প্রার্থনা করেন রাজবনবিহারের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য বিজয় গিরি চাকমা, এবং মৈত্রী ভাবনা ও পরিত্রাণ সূত্র শ্রবণের মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ পায়।
মন্ত্রীর বক্তব্য ও ঐক্যের আহ্বান
অনুষ্ঠানে অতিথির বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেন, "ভেদাভেদ না রেখে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে পার্বত্য অঞ্চলসহ বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষার মাধ্যমেই পার্বত্য চট্টগ্রামে সুখ–শান্তি ফিরে আসবে।" তার এই বক্তব্য উৎসবের মৌলিক চেতনাকে প্রতিফলিত করে।
সার্বিকভাবে, পার্বত্য অঞ্চলের এই উৎসবগুলো শুধুমাত্র বর্ষবরণের আনন্দই নয়, বরং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সম্প্রীতি ও মৈত্রীর বন্ধনকে শক্তিশালী করার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, যা বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।



