ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈশাখী শোভাযাত্রা ১৪৩৩: ঐতিহ্য ও গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের বার্তা
বাংলা নতুন বছর ১৪৩৩ কে বরণ করে নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা ১৪৩৩’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন সকাল ৮টার দিকে দেখা গেছে, চারুকলা অনুষদের সামনে স্ক্রল পেইন্টিং ও মোটিফ সাজানো রয়েছে এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে শোভাযাত্রা
বহু বছর ধরে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে এই শোভাযাত্রা। যদিও সময়ের সাথে এর নাম পরিবর্তন হয়েছে, তবুও এটি আমাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবেই টিকে রয়েছে। ২০১৬ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো এই শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করে, যা এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করে।
বাংলা নববর্ষ উদযাপনের এই শোভাযাত্রাটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছে:
- যশোরে ‘বর্ষবরণ শোভাযাত্রা’
- ঢাকায় ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’
- তিন দশকেরও বেশি সময় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’
- বর্তমানে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’
নাম পরিবর্তন সত্ত্বেও এর উৎসবমুখরতা ও জনপ্রিয়তা কখনোই কমেনি, বরং এটি জাতীয় সংহতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে বিকশিত হয়েছে।
এবারের শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য ও মোটিফ
এই বছরের শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘নববর্ষের সুরে ঐক্য, গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ’। শোভাযাত্রায় পাঁচটি বিশেষ মোটিফ প্রদর্শিত হয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে:
- একটি মোরগ: গণতান্ত্রিক ভোরের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
- একটি হাতি: সোনারগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী মোটিফের স্মারক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
- একটি পায়রা: শান্তির প্রতীক হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছে।
- একটি টেপা পুতুল-ঘোড়া: গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোকশিল্পকে নির্দেশ করে।
- একটি দোতারা: বাউল সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে এবং তাদের ওপর হামলার প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
পটচিত্রের মাধ্যমে ইতিহাস ও সংস্কৃতির চিত্রণ
এবারের শোভাযাত্রায় পাঁচটি মোটিফের পাশাপাশি পাঁচটি পটচিত্রও প্রদর্শিত হয়েছে, যেগুলোর কাজ করেছেন প্রখ্যাত পটচিত্রী টাইগার নাজির। এসব পটচিত্রে বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে:
- সুন্দরবনে জীবিকা নির্বাহকারীদের প্রতিনিধিত্বকারী ‘দেবী বনবিবি’
- বাংলা নববর্ষের প্রবর্তক মুঘল সম্রাট আকবর
- বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের চিত্র
- লোকচিত্রকলা গাজীর পট
- মঙ্গলকাব্য মনসামঙ্গল-এর চরিত্র বেহুলা
শোভাযাত্রার আনুষ্ঠানিকতা ও অংশগ্রহণকারীদের ক্রম
চলতি বছরের শোভাযাত্রা শুরু হয়েছে পুলিশের অশ্বারোহী দল দিয়ে, যা নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে কাজ করেছে। এরপর জাতীয় পতাকা বহনকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছেন, যারা দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের চেতনা প্রকাশ করেছেন।
শোভাযাত্রার আনুষ্ঠানিক ক্রম নিম্নরূপ:
- সাংবাদিকদের মিছিল
- প্রধান ব্যানার নিয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এগিয়ে যাওয়া
- বিভিন্ন অনুষদের ডিন এবং আবাসিক হলগুলোর প্রভোস্টদের অংশগ্রহণ
- বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীদের মিছিল
- জাসাস (জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা) এবং জাতীয় কবিতা পরিষদের যৌথ মিছিল
- পাঁচটি বড় মোটিফ, ঢাকের দল এবং ১৫০ ফুট দীর্ঘ স্ক্রল পেইন্টিং প্রদর্শন
- সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী এবং ১১৫টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ
এই শোভাযাত্রা কেবল একটি উৎসব নয়, বরং এটি বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জাতীয় সংহতির একটি জীবন্ত প্রদর্শনী হিসেবে কাজ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ এটিকে একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত করেছে, যা নতুন বছরের আশা ও সম্ভাবনার বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।



