মাদারীপুরের কালকিনিতে ২৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলা
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায় দীপাবলি ও কালীপূজা উপলক্ষে প্রায় আড়াইশ বছর ধরে ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলার আয়োজন চলে আসছে। এই মেলা বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, চেতনা ও সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে টিকে আছে। সময়ের পরিবর্তন, আধুনিকতার ছোঁয়া কিংবা সামাজিক রূপান্তরের মধ্যেও এই মেলা তার নিজস্ব ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্য অটুট রেখেছে।
মেলার ঐতিহাসিক পটভূমি
মেলার আয়োজকরা জানান, হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব দীপাবলি ও কালীপূজা ঘিরে ১৭৮৩ সালে ভুরঘাটা এলাকার দীননাথ কুন্ডু ও মহেশ কুন্ডু এই মেলার প্রবর্তন করেন। কুন্ডুদের বংশের নামানুসারে এই মেলার নামকরণ করা হয় কুন্ডুবাড়ির মেলা। সেই সময় দীপাবলির পরের দিন এই অঞ্চলের বিভিন্ন কালী প্রতিমা জড়ো করা হতো এবং সেরা প্রতিমার জন্য পুরস্কার দেওয়া হতো। চিত্তবিনোদনের জন্য পুতুলনাচ, কবিগান, জারিগান, পালাগান, নৌকা বাইচের আয়োজন করা হতো। কালের বিবর্তনে পালাগান, জারিগান, নৌকাবাইচ বন্ধ থাকলেও নাগরদোলার আয়োজন এখনো রয়েছে।
মেলার বর্তমান রূপ ও বিস্তার
কালকিনি পৌর এলাকার গোপালপুরের কুন্ডু বাড়িতে এ মেলার সূচনা হয়। দীপাবলি ও কালীপূজা ঘিরে ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে শুরু হলেও সময়ের পরিক্রমায় এটি এখন বৃহৎ লোকজ উৎসবে পরিণত হয়েছে। এখন শুধু প্রতিমা প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মিলনমেলা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে মেলা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মেলা বসে প্রতি বছর। শুধু কুন্ডুবাড়ি নয়, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গোপালপুর থেকে ভুরঘাটা পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে বসে শত শত দোকান।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দোকানিরা বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন। কাঠের বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্রের জন্য এই মেলা বিশেষভাবে বিখ্যাত। মেলায় মাদারীপুর ছাড়াও ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, বরিশাল, খুলনা, বাগেরহাট, মাগুরা, যশোর, নড়াইলসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা মাটির, বাঁশের ও কাঠের তৈরি বিভিন্ন মালামাল বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন। এখন ফার্নিচারের চাহিদাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
মন্দির কমিটি ও আয়োজনের দায়িত্ব
কুন্ডুবাড়ি মন্দির কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, মন্দিরের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে কুন্ডু পরিবারের সদস্যরা ভূমিকা রেখে আসছেন। এখানে অর্থায়নে রয়েছেন—মৃত নেপাল চন্দ্র কুন্ডুর ছেলে ভজন চন্দ্র কুন্ডু, মৃত সুধীর চন্দ্র কুন্ডুর ছেলে বিমল চন্দ্র কুন্ডু, মৃত জানকি চন্দ্র কুন্ডুর ছেলে বলরাম চন্দ্র কুন্ডু, মৃত কালিপদ চন্দ্র কুন্ডুর ছেলে স্বপন চন্দ্র কুন্ডু, মৃত নরেন্দ্র নাথ চন্দ্র কুন্ডুর ছেলে বৃন্দাবন চন্দ্র কুন্ডু ও খোকন চন্দ্র কুন্ডু। বংশপরম্পরায় মন্দির পরিচালনা ও মেলার আয়োজন করে আসছেন তারা।
মেলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব
ভজন চন্দ্র কুন্ডু ও বিমল চন্দ্র কুন্ডুর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কালীপূজার পরের দিন থেকেই মূলত মেলার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। তবে পূজার কয়েকদিন আগে থেকেই মেলার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। তারা কাঠের আসবাবপত্র, মাটির তৈজস, বাঁশ ও বেতের তৈরি পণ্যসহ নানা ধরনের গ্রামীণ সামগ্রী নিয়ে পসরা সাজান। পূজার আগ থেকেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের আসা-যাওয়া শুরু হয়। মেলার দিনগুলোতে কুন্ডু বাড়ি এলাকা রূপ নেয় জনসমুদ্রে।
দূর-দূরান্ত থেকে হাজারো মানুষ এই মেলায় অংশ নিতে আসেন। মেলার সময় পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে মুখর থাকে পুরো এলাকা। বেচাকেনাও চলে জমজমাট। বিশেষ করে কাঠের তৈরি আসবাবপত্র মেলার অন্যতম আকর্ষণ। এখানকার তৈরি কাঠের খাট, আলমারি, চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি ক্রেতাদের কাছে সমাদৃত। পাওয়া যায় নানা ধরনের হস্তশিল্প, খেলনা, মাটির পণ্য, গ্রামীণ ব্যবহার্য সামগ্রী এবং খাদ্যদ্রব্য। শিশু-কিশোরদের জন্য থাকে নাগরদোলা, খেলাধুলা ও বিনোদনের আয়োজন।
সবমিলিয়ে মেলা পরিণত হয় প্রাণবন্ত উৎসবে। এটি এখন কেবল বাণিজ্যিক কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বরং অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গ্রামীণ কারিগর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বড় বাজার হিসেবেও ধরা দিয়েছে। যেখানে তারা সরাসরি ক্রেতাদের কাছে তাদের পণ্য বিক্রি করতে পারেন। অনেকের জন্য মেলাটি বছরের অন্যতম আয়ের উৎস।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ
স্থানীয় লোকজন বলছেন, মেলাটি দক্ষিণবঙ্গের সর্ববৃহৎ। দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে আসেন অনেকে। এত বড় মেলা চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবে না অনেকের। এখানে সব ধরনের জিনিসপত্র পাওয়া যায়। ৩৫ বছর ধরে মেলায় আসবাবপত্র বিক্রি করে আসছেন সমীর দাশ। তিনি বলেন, ‘ক্রেতাদের চাহিদা বুঝে বিভিন্ন ডিজাইনের আসবাবপত্র মেলায় নিয়ে যাই। অনেক কাঠের দোকান বসে মেলায়। সবারই টার্গেট থাকে কম দামে বেশি পণ্য বিক্রি করার। এজন্য বিক্রিও বেশি হয়। প্রতিদিন বহু মানুষ জিনিসপত্র কিনতে আসেন।’
স্থানীয় লোকজন জানান, ঐতিহ্যবাহী কুন্ডু বাড়ির মেলা আগে পাঁচ-ছয় দিন ধরে চললেও ২০২৪ সালে তিন দিনের ও ২০২৫ সালে প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে দুই দিনের জন্য বসেছিল। ওই সময় স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তির আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে মেলার আয়োজন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল উপজেলা প্রশাসন। এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দুই-তিন দিনের জন্য মেলার অনুমতি দেয় জেলা প্রশাসন।
মেলার আবেগ ও সামাজিক বন্ধন
এই মেলা স্থানীয়দের কাছে শুধু একটি উৎসব নয়, বরং একটি আবেগের জায়গা। প্রতি বছর মেলা ঘিরে তাদের মাঝে উৎসাহ-উদ্দীপনা কাজ করে। দূরের আত্মীয়-স্বজন দেখা করতে আসেন। পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে পুনর্মিলন হয়। সব মিলিয়ে সবার কাছে এটি হয়ে উঠেছে আনন্দঘন মিলনমেলা। মেলার আয়োজন নিয়ে কুন্ডুবাড়ির সদস্য বলরাম কুন্ডু বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকে দেখে আসছি এখানে মেলা হয়। তবে ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল, তা আমাদের জানা নেই। বাপ-দাদারা করে গেছেন তাই আমরাও করছি। পূজা উপলক্ষে প্রতি বছর কার্তিক মাসে মেলার আয়োজন করা হয়। গত ২০ অক্টোবর ১৫টি শর্ত দিয়ে দুই দিনের জন্য মেলার অনুমতি দিয়েছিল জেলা প্রশাসন। আগে সাধারণত পাঁচ-ছয় দিনব্যাপী মেলা হতো। এখন সরকার যে কয়দিনের অনুমতি দেয়, সে কয়দিনই মেলা হয়।’
কালকিনির ভূরঘাটা কুন্ডুবাড়ি কালীমন্দিরের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি স্বপন কুমার কুন্ডু বলেন, ‘কুন্ডুবাড়ির মেলা আমাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য বহন করে আসছে। হিন্দু-মুসলিম সবার সহযোগিতা ও অংশগ্রহণে এটি বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। এটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা চাই এই ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ুক।’



