রাঙামাটিতে বৈসাবি উৎসবের শুভ সূচনা
বর্ষ বিদায় ও বরণকে কেন্দ্র করে পার্বত্য জেলা রাঙামাটি এখন উৎসবের রঙে সেজেছে। বৈসাবি উৎসব নামে পরিচিত এই সামাজিক অনুষ্ঠানটি পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বৃহত্তম আয়োজন হিসেবে বিবেচিত। সোমবার বিকালে রাঙামাটির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে পাঁচ দিনব্যাপী নানা আয়োজন।
শোভাযাত্রা ও মেলার উদ্বোধন
উৎসবের সূচনায় সোমবার বিকালে রাঙামাটি সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়। এটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীরা নিজ নিজ জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে অংশগ্রহণ করেন, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে।
পরে সেখানে ফিতা কেটে পাঁচ দিনব্যাপী আয়োজিত মেলার উদ্বোধন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান এমপি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে মেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। উদ্বোধনের পর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা মনোজ্ঞ ‘সম্প্রীতি নৃত্য’ পরিবেশন করেন, যা দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়।
মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের বক্তব্য
উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেন, ‘পাহাড়ের ১৩টি ভাষাভাষী মানুষ বর্ষ বিদায় ও বরণকে কেন্দ্র করে এই উৎসব পালন করে থাকেন। সবার অধিকার রক্ষায় সরকার কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সমতল বা পাহাড় হোক, কোথাও কোনও বৈষম্য থাকবে না।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘প্রতি বছর পাহাড়ের মানুষ অপেক্ষায় এই দিনটির জন্য। উৎসবকে কেন্দ্র করে সব সম্প্রদায়ের মিলন মেলায় রূপ নেয় পুরো পাহাড়। এই মিলন মেলা আমাদের ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এই উৎসব পাহাড়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসবে রূপ নিয়েছে।’
মন্ত্রী বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, ‘পাহাড়ে এই উৎসব বৈসাবি নামে হলেও সব জাতিগোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। তাই সেই ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকার আহ্বান জানাই সবাইকে। চাকমাদের বিজু, মারমাদের সাংগ্রাই, ত্রিপুরাদের বৈসু, তংচংঙ্গাদের বিষু, ম্রো ও চাকদের চাংক্রান। বাঙালির নববর্ষ ও পাহাড়ের এই প্রাণের মানবিক উৎসব মিলেমিশে একাকার হয়ে পাহাড়ের বুকে তৈরি করেছে এক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মহোৎসব।’
মেলার বৈশিষ্ট্য ও অনুষ্ঠান
উৎসবের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার বিকালে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে সূচনা হয়েছে সাত দিনব্যাপী মেলার। মেলায় বাহারি রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে উপস্থিত হন পাহাড়ের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ, যেখানে বাঙালিরাও অংশগ্রহণ করেন। এটি এক সম্প্রীতির মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে।
মেলায় বিভিন্ন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাকসহ পাহাড়ের নারীদের হাতে ও তাঁতে বোনা কাপড়, ব্যাগ এবং নানান হস্তশিল্পের স্টল বসানো হয়েছে। প্রথম দিন বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ছাড়াও সাগ্রাই জলোৎসব, ঐতিহ্যবাহী পাঁজন রান্না প্রতিযোগিতা, ত্রিপুরা গরাইয়া নৃত্য, ঘিলা খেলা, ম্রো জনগোষ্ঠীর নাটকসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হয়।
পাঁচ দিনব্যাপী মেলায় ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন খেলাধুলা, শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, পিঠা উৎসব, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মঞ্চ নাটক অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ১০ এপ্রিল মেলা শেষ হবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য
আলোচনা সভায় রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদারের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। বিশেষ অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ চাকমা, রাঙামাটি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক, জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, সদর জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. একরামুল রাহাত, পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, ‘পাহাড়ে সব সম্প্রদায়ের মানুষকে একে অপরের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি আরও বলেন পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সন্ত্রাসী দলগুলো কাজ করে তাদের উদ্দেশ্যে একটি বাণী দিতে চাই। আমরা যুদ্ধ নয়, শান্তিতে বিশ্বাসী। আমরা আশা করি, আপনারা আপনাদের ভুল বুঝতে পারবেন। অস্ত্র জমা দিয়ে আলোচনায় ফিরবেন। আসুন আলোচনা করি। আলোচনায় বসে দেখি দেশকে, পার্বত্য এলাকাকে কীভাবে এগিয়ে নিতে পারি। কীভাবে অর্থনৈতিক মুক্তি পাবো।’
সভাপতির বক্তব্যে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার বলেন, ‘পার্বত্যাঞ্চলে ১৩ ভাষাভাষীর জাতিসত্তা রয়েছে। তাদের রয়েছে সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ইতিহাস। কাউকে পিছিয়ে রেখে নয়, সব জাতিসত্তাকে একত্র করে এগিয়ে যেতে হবে। এই মেলার মাধ্যমে আমাদের ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির যাতে আরও উন্নতি হয়, সংরক্ষিত থাকে এবং সবার মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে আমরা এই ধরনের অনুষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে আয়োজন করছি।’
ভবিষ্যতের আয়োজন
আগামী ৯ এপ্রিল থেকে বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, বিহু, সাংক্রাই, চাংক্রান, পাতা উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে শুরু হবে চার দিনব্যাপী নানান ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান। অন্যান্য আরও অনুষ্ঠান ছাড়াও আগামী ১৭ এপ্রিল মারমা সংস্কৃতি সংস্থার সাংগ্রাই জলোৎসবের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পার্বত্য রাঙামাটির বৈসাবির আনুষ্ঠানিকতা।
এই উৎসব শুধুমাত্র একটি সামাজিক অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সম্প্রীতির একটি জীবন্ত উদাহরণ। রাঙামাটি জুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই উৎসবের আমেজ স্থানীয়দের পাশাপাশি দর্শনার্থীদেরও আকর্ষণ করছে, যা পার্বত্য অঞ্চলের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরছে।



