জয়পুরহাটের ঐতিহ্যবাহী মেলায় ১১ লাখ টাকার ঘোড়া 'যুবরাজ', দর-কষাকষিতে উত্তেজনা
জয়পুরহাটের মেলায় ১১ লাখ টাকার ঘোড়া 'যুবরাজ'

জয়পুরহাটের ঐতিহ্যবাহী মেলায় ১১ লাখ টাকার ঘোড়া 'যুবরাজ'

জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার গোপীনাথপুরে চলমান দোলপূর্ণিমা মেলায় 'ঘোড়ার হাট' নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে উৎসাহ ও উত্তেজনার পরিবেশ। ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই প্রাচীন মেলায় এবার দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতা-বিক্রেতারা জড়ো হয়েছেন, যেখানে পছন্দের ঘোড়া ঘিরে দর-কষাকষি, হাঁকডাক এবং দর্শনার্থীদের ভিড়ে মেলা প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।

ঘোড়া 'যুবরাজ' হয়ে উঠেছে মেলার কেন্দ্রবিন্দু

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে মেলা পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, এবার মোটামুটি সংখ্যক ঘোড়া আনা হয়েছে, কিন্তু দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে একটি বিশেষ ঘোড়া। ধূসর রঙের, উঁচু ও লম্বা গড়নের এই ঘোড়াটির নাম রাখা হয়েছে 'যুবরাজ', যার বয়স প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর। ভারতীয় তাজি জাতের এই ঘোড়াটির দাম হাঁকা হচ্ছে ১১ লাখ টাকা, তবে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় মালিক আজ শুক্রবার সকাল পর্যন্ত সেটি বিক্রি করেননি।

ঘোড়াটির মালিক নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার শাহরিয়ার ইসলাম সাগর জানান, 'যুবরাজ' অত্যন্ত দ্রুতগতির এবং বিভিন্ন ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কারও পেয়েছে। তিনি নিজের তত্ত্বাবধানেই ঘোড়াটির যত্ন নিয়েছেন। এখন পর্যন্ত ঘোড়াটির সর্বোচ্চ দর উঠেছে সাড়ে ৭ লাখ টাকা, এবং তিনি বলেন, '১০ লাখ টাকা হলে ঘোড়াটি ছেড়ে দেবেন।'

মেলার ঐতিহ্য ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

একাধিক ঘোড়া ব্যবসায়ী ও ক্রেতা জানান, তাঁদের পূর্বপুরুষেরাও এই মেলায় ঘোড়া কেনাবেচা করতেন, এবং সেই পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতেই তাঁরা এখনো এ মেলায় অংশ নেন। তবে আগে ঘোড়দৌড়ের জন্য বিস্তীর্ণ মাঠ থাকলেও এখন তা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় বেচাকেনায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।

ঘোড়া ব্যবসায়ী ইমদাদুল হক বলেন, 'দিন দিন ঘোড়ার মেলার জৌলুশ কমে আসছে। আগের মতো বিস্তীর্ণ মাঠ না থাকায় ঘোড়দৌড় আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়েছে, ফলে কেনাবেচাতেও কিছুটা প্রভাব পড়ছে।' অন্যদিকে, দিনাজপুর থেকে ঘোড়া কিনতে আসা আকরাম হোসেন বলেন, 'অন্য বছরের তুলনায় এবার মেলায় ঘোড়ার আমদানি ভালো হয়েছে, তবে ভালো জাতের ঘোড়া খুব বেশি নেই। ভারতীয় তাজি জাতের বড় ঘোড়াটি মেলার প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।'

প্রশাসনের তদারকি ও মেলার ইতিহাস

গোপীনাথপুর মন্দিরের সেবায়েত রণেন্দ্র কৃষ্ণ প্রিয়া জানান, প্রতিবছর দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে এ মেলা বসে, এবং এবার মেলার ৫১৯তম আয়োজন চলছে ৩ মার্চ থেকে। নির্ধারিত সময় ১৩ দিন হলেও পরিস্থিতি অনুযায়ী সময় বাড়ানো হয়। তিনি উল্লেখ করেন, জয়পুরহাটের জেলা প্রশাসকও মেলা পরিদর্শনে এসেছেন, এবং উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

আক্কেলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা জান্নাত বলেন, 'গোপীনাথপুরের মেলাটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী। মেলাকে ঘিরে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং সার্বিক পরিস্থিতি প্রশাসনের নজরদারিতে আছে।'

এই মেলা শুধু ঘোড়া কেনাবেচার জন্যই নয়, বরং স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা বছরের পর বছর ধরে মানুষকে আকর্ষণ করে আসছে।