কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একুশের প্রস্তুতি: আলপনায় ভিন্নতা ও কড়া নিরাপত্তা
আমাদের জাতীয় জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি ‘শহীদ দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে’ এখানে ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের স্মরণ করা হয়। এবারও দিবসটিকে কেন্দ্র করে শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে প্রস্তুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। বৃহস্পতিবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দেখা গেছে, কড়া নিরাপত্তার মধ্যে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আঁকা হচ্ছে মোট ৯টি আলপনা।
আলপনায় রঙের পরিবর্তন ও ভিন্নতা
এবারের আলপনায় সাদা, হলুদ, গোলাপী ও নীল রঙ ব্যবহার করা হচ্ছে। সেগুলোর মধ্যে আটটির কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে এবং আরেকটি রাতের মধ্যে আঁকা হবে। তবে গত বছর সাদা, কালো ও লাল রঙে আলপনা আঁকা হয়েছিল। এবার এই ভিন্নতা কেন জানতে চাইলে আলপনা কমিটির আহ্বায়ক কাউসার হাসান টগর গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গত বছর আমরা জুলাই অভ্যুত্থানকে সামনে রেখে আমাদের আলপনাগুলো এঁকেছিলাম। এবার যেহেতু বাংলাদেশ একটা স্বাভাবিক ধারায় ফিরেছে, গণতান্ত্রিক ধারায় প্রত্যাবর্তন করেছে তাই আমরা আমাদের সেই ঐতিহ্যগত যে আলপনা আছে তাতে ফেরত গিয়েছি।’
গ্রাফিতির পরিবর্তে ক্যানভাস ও সাজসজ্জা
প্রতি বছর শহীদ মিনার এলাকার দেয়ালে বিভিন্ন স্লোগান, কবিতা ও গানের লাইন লেখা হলেও এবার থাকবে না কোনও গ্রাফিতি। তবে সেখানে আলাদা করে গান, কবিতা ও স্লোগানের ক্যানভাস ঝুলবে বলে জানান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সাজসজ্জা কমিটির প্রধান অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের সময় দেয়ালে বিভিন্ন গ্রাফিতি থাকায় সেগুলো সংরক্ষণের জন্য নতুন করে কোনও দেয়ালিকা আঁকা হয়নি। তবে আমরা বেশ কয়েকটি ক্যানভাস ঝুলিয়ে দেবো, যেখানে ভাষা আন্দোলন ও শহীদ দিবসের সেই কবিতা, গান ও শ্লোক থাকবে।’
প্রতি বারের মতো এবারও শহীদ মিনার এলাকায় সাজ-সজ্জার দেখভাল করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে সাজসজ্জা কমিটির প্রধান আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের প্রায় ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী কাজ করছে। দোয়েল চত্বর থেকে শহীদ মিনার হয়ে জগন্নাথ হলের মোড় পর্যন্ত সব সড়কে আলপনা আঁকা হবে।’
নিরাপত্তা ও যান চলাচল ব্যবস্থা
একুশে ফেব্রুয়ারি ঘিরে শহীদ মিনার ও আশপাশের এলাকা সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে। পাশেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ প্রাঙ্গণে তৈরি করা হয়েছে ঘোষণা মঞ্চ। সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ প্রাঙ্গণে পুলিশ ও আর্মিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণকক্ষ রয়েছে; আছে ফায়ার সার্ভিস ও প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্রও।
মাতৃভাষা দিবস ঘিরে কয়েকটি সড়কে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে রমনা থানার ট্রাফিক বিভাগ। বকশি বাজার থেকে জগন্নাথ হল সড়ক, চাঁনখারপুল থেকে রোমানা চত্বর ক্রসিং সড়ক, টিএসসি থেকে শিববাড়ী ও উপাচার্য ভবন থেকে ভাষ্কর্য ক্রসিং সড়কে যান চলাচল প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে পলাশীর মোড় থেকে শহীদ মিনার হয়ে দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট মোড়, টিএসসি মোড় ও শহিদুল্লাহ হল মোড়ে পায়ে হেঁটে চলাচলের জন্য সুযোগ রাখা হয়েছে।
ঢাবিতে প্রবেশে কড়াকড়ি ও কর্মসূচি
শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা পর ক্যাম্পাসে প্রবেশে কড়াকড়ি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকবে বলে জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বৃহস্পতিবার জনসংযোগ দফতরের এক বিজ্ঞপ্তিতে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় বসবাসকারীদের শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে আবাসস্থলে ফিরতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিশেষ জরুরি প্রয়োজনে নিরাপত্তা পাস ও পরিচয়পত্র ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।
ঢাবি কর্তৃপক্ষের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে:
- উপাচার্য ভবনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রধান ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা ও কালো পতাকা উত্তোলন
- বাদ আসর বিশ্ববিদ্যালয়ের সব মসজিদ এবং অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে ভাষা শহীদদের রুহের মাগফেরাত বা শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত বা প্রার্থনা
- ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৬টায় উপাচার্যের নেতৃত্বে মৌন মিছিল ও প্রভাতফেরি বের করা হবে
- ‘স্মৃতি চিরন্তন’ চত্বর থেকে শুরু হওয়া প্রভাত ফেরিটি উদয়ন স্কুল হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গমন করবে এবং পরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে
