একুশে ফেব্রুয়ারি: শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের প্রস্তুতি সম্পন্ন
একুশে ফেব্রুয়ারি: শহীদ দিবস ও মাতৃভাষা দিবস পালন

একুশে ফেব্রুয়ারি: ভাষা শহীদদের স্মরণে জাতীয় শ্রদ্ধা নিবেদন

আগামীকাল শনিবার মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হবে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ৭৪তম বার্ষিকীতে জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় জীবন উৎসর্গকারী বীর সন্তানদের। সারাদেশে এই দিনটি যথাযথ মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালনের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রথম প্রহরে শ্রদ্ধা নিবেদন

একুশের কর্মসূচির শুরু হবে রাত ১২টা ১ মিনিটে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে। কালো ব্যাজ ধারণ করে সর্বস্তরের মানুষ ভাষা শহীদদের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ভোরের প্রথম প্রহরেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি

উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করে। বর্তমানে সারাবিশ্বে এই দিনটি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা ও ভাষাগত বৈচিত্র্য উদযাপনের দিন হিসেবে পালিত হয়।

ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের পটভূমি

১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে সালাম, রফিক, শফিক, জব্বার ও বরকত শহীদ হন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজ বপন করে। ভাষা আন্দোলন থেমে থাকেনি এবং ১৯৫৬ সালের ২৯শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার বাংলাকে উর্দুর পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচি

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশব্যাপী দিনটি পালনের জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ১৩ জানুয়ারি বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্মরণীয়, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে দিবসটি পালন করা হবে।

প্রধান কর্মসূচিসমূহ:
  • সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে
  • বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার, বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেল এবং প্রিন্ট মিডিয়ায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সঠিক নিয়মাবলী সম্পর্কে বিশেষ নির্দেশনা প্রচার করা হবে
  • শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ ও আজিমপুর গোরস্থানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে
  • সারাদেশের মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ভাষা শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ প্রার্থনা করা হবে

সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ড

বাংলাদেশ শিশু একাডেমি শিশুদের জন্য চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, ছড়া ও কবিতা আবৃত্তি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। বাংলা একাডেমিতে একুশে বইমেলা চলবে, যেখানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, জাতীয় বই কেন্দ্র, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করবে।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ও এর শাখা জাদুঘর, শিল্পাচার্য জয়নুল লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীন সব প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও জাদুঘরে শিশু, কিশোর-কিশোরী, শিক্ষার্থী, প্রবীণ নাগরিক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ থাকবে।

রাজধানী ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদযাপন

ঢাকার বিভিন্ন সড়কদ্বীপ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বাংলাসহ দেশের সব নৃ-গোষ্ঠীর বর্ণমালা সম্বলিত ফেস্টুন দিয়ে সজ্জিত করা হবে। গণযোগাযোগ অধিদপ্তর ঢাকা মহানগরীতে ট্রাকভিত্তিক মোবাইল সঙ্গীতানুষ্ঠান এবং রাজধানীর চারপাশের জলপথে নৌকাভিত্তিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মোবাইল চলচ্চিত্র প্রদর্শনীরও ব্যবস্থা করা হবে।

বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করবে। গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের গণগ্রন্থাগারে ভাষা আন্দোলন বিষয়ক রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।

জাতীয় ছুটির দিন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

দিবসটি জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হবে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, ঢাকায় অবস্থিত বিদেশি কূটনীতিকবৃন্দ, মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধি, একুশে উদযাপনের সাথে সংশ্লিষ্ট সংগঠন এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ৩০ মিনিটের জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলবৎ থাকবে যাতে গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ নির্বিঘ্নে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারেন।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সব সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ জাতীয় কর্মসূচির আলোকে দিবসটি পালন করবে, যা ভাষা আন্দোলনের শহীদদের সম্মানে সারাদেশে ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে।