রোজা এলেই প্রাণ ফিরে পুরান ঢাকায়, চকবাজারে চার শতাব্দীর ইফতার উৎসব
রোজা এলেই প্রাণ ফিরে পুরান ঢাকায়, চকবাজারে ইফতার উৎসব

রোজা এলেই প্রাণ ফিরে পুরান ঢাকায়, চকবাজারে চার শতাব্দীর ইফতার উৎসব

রমজান মাস এলেই রাজধানী ঢাকার প্রাণ যেন পুরান ঢাকায় এসে থামে। চকবাজারে ইফতার বাজারের শিকড় প্রায় চার শতাব্দী গভীরে প্রোথিত। ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দে শায়েস্তা খান নির্মাণ করেন চকবাজার শাহী মসজিদ। পরে ১৭০২ সালে মুর্শিদ কুলি খাঁ চকবাজারকে আধুনিক বাজারে রূপ দেন। সেই সময় থেকেই রমজান মাসে এখানে বসতে শুরু করে মুখরোচক ইফতারির ভাসমান বাজার। ইতিহাসের সেই পথচলা আজও সমান প্রাণবন্ত ও জমজমাট।

ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যের কেন্দ্রবিন্দু চকবাজার

প্রতিবছর রমজান এলেই শাহী মসজিদের সামনের সড়কজুড়ে বসে বাহারি ইফতারির পসরা। বংশপরম্পরায় অনেকে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সারা বছর অন্য পেশায় থাকলেও রমজানে তারা ফিরে আসেন চকের চেনা ঠিকানায়। পুরান ঢাকার আদি বাসিন্দারা ইফতারকে বলতেন ‘রোজা খোলাই’—প্রাচীন এই পরিভাষা এখনো অনেকের মুখে শোনা যায়।

বর্তমানে শুধু চকবাজার নয়, বাংলাবাজার, সদরঘাট, নবাবপুর, বংশাল, সিদ্দিকবাজার, গুলিস্তান, ওয়ারী, লক্ষ্মীবাজার, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, আরমানিটোলা, সুরিটোলা, কাপ্তানবাজার, চানখাঁর পুল, আজিমপুর, টিপু সুলতান রোড, ধোলাইখালসহ পুরান ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকায় ইফতারির জমজমাট বাজার বসে। তবে ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যের দিক থেকে চকবাজারই কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়।

প্রথম রোজার সরেজমিন চিত্র

বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রমজানের প্রথম দিন সরেজমিনে দেখা যায়, দুপুর গড়াতেই রাস্তাজুড়ে সারি সারি দোকান বসেছে। বেলা দুইটার পর থেকেই পুরান ঢাকার পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসছেন। ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়ে হাঁটার জায়গা পর্যন্ত মিলছে না।

চকের দোকানগুলোতে বিশাল শিকে জড়ানো সুতি কাবাব ও জালি কাবাব, টিক্কা কাবাব, মোরগ পোলাও, লাবাং, পরোটা, ছোলা, কাটলেট, শাহী জিলাপি, পেঁয়াজু—কী নেই! রয়েছে শাকপুলি, ডিম চপ, কাচ্চি বিরিয়ানি, তেহারি, কবুতর ও কোয়েলের রোস্ট, খাসির রানের রোস্ট, দইবড়া, হালিম, নূরানি লাচ্ছি, পনির, পেস্তা বাদামের শরবত, ছানামাঠা, কিমা পরোটা, ঘুগনি, বেগুনি, আলুর চপ। ফলের বাজারেও পেঁপে ১৪০ টাকা কেজি, তরমুজ ১০০ টাকা কেজি, আনারস ৮০-১০০ টাকা পিসে বিক্রি হচ্ছে।

ঐতিহ্যবাহী পদ ও ব্যবসায়ীদের কথা

চকের ঐতিহ্যবাহী একটি পদ ‘বড় বাপের পোলায় খায়’। খাসির মাংস, ডিম, গরুর মগজ, কলিজা, মুরগির কুঁচি, সুতি কাবাব, কিমা, চিড়া, ডাল, মিষ্টিকুমড়াসহ প্রায় শতাধিক উপকরণে তৈরি এ পদ ঘিরে এখনো শোনা যায় ছড়া—‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙায় ভইরা লইয়া যায়…’

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রুহুল আমিন ১২ বছর ধরে ফালুদা, ফিরনি ও লাবাং বিক্রি করছেন। লাবাং প্রতি লিটার ১২০ টাকা, ছোট বাটি ফিরনি ৫০ টাকা, ফালুদা ১৪০ টাকা কেজি। গোপীনাথ ঘোষ ৩০ বছর ধরে মাঠা ও থানা বিক্রি করছেন—মাঠা ১২০ টাকা লিটার, থানা ৫০ টাকা পিস। দীন মোহাম্মদ খোকন ৩৫ বছর ধরে আচার বিক্রি করছেন; দেড়শ টাকা থেকে শুরু করে এক হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতি বৈয়াম আচার বিক্রি হয়।

‘আল্লাহ মেহেরবানি ক্যাটারিং’-এর সিয়াম মমিন জানান, হাঁস ভুনা ও পোলাও বোল ২০০০ টাকা, কানা মুরগির মোরগ পোলাও ৩০০ টাকা, চিকেন স্পেশাল দম বিরিয়ানি ২০০ টাকা, সাদা পোলাও ২৫০ টাকা। মিলন বাবুর্চি ৩০ বছর ধরে টিক্কা কাবাব (৫০ টাকা পিস), কোয়েল (৮০ টাকা), গরুর সাসলিক (৮০ টাকা), জালি কাবাব (৪০-৬০ টাকা), মুরগির চাপ (১৫০ টাকা) বিক্রি করছেন।

হারুন বাবুর্চির মৃত্যুর পর তার ছেলেরা এখন দোকান সামলান। তাদের দোকানে খাসির সুতা কাবাব ১২০০ টাকা কেজি, গরুর শাহী সুতি কাবাব ১০০০ টাকা, খাসির রানের রোস্ট ১০০০ টাকা পিস, হাঁস রোস্ট ১০০০ টাকা, মুরগি রোস্ট ৩৫০-৪০০ টাকা, কোয়েল ৮০ টাকা, কবুতর ১২০ টাকা। শাহী জিলাপি ৪০০ টাকা কেজি, বড় জিলাপি ২০০ টাকা, দইবড়া ১৮০-২০০ টাকা কেজি, কিমা পরোটা ৫০-৬০ টাকা।

মো. ইসা জানান, মাঝারি আকারের আস্ত খাসির কাবাব ৪ থেকে ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে; বড় পরিবার বা পার্টির জন্য চাহিদা বেশি। আব্দুল জব্বার ৩০-৪০ বছর ধরে দইবড়া বিক্রি করছেন—ছোট বাটি ১৫০, বড় বাটি ৩০০ টাকা। মোহাম্মদ আব্দুল করিমের দোকানে চিকেন ললি ৭০, সাসলিক ৫০, তান্দুরি পিস ১০০, হারিয়ালি ১৬০, রেশমি মালাই ২৫০ টাকা স্টিক। লালবাগ শাহী মসজিদের পাশে মোহাম্মদ সালেহ ২০ বছর ধরে দোকান দিচ্ছেন; আনাম জামাই খাসি ১২ হাজার টাকা, ফালুদা ও পেস্তা শরবত ২০০ টাকা লিটার।

ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা ও প্রতিক্রিয়া

চকবাজার শাহী মসজিদ এলাকায় তিন থেকে চারশ’ ইফতারের দোকান বসেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, প্রথম দিন দাম মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে বাড়তে পারে।

লালবাগ এলাকার বাসিন্দা মিমো বলেন, তিনি জন্ম থেকেই এই এলাকার মানুষ, প্রতিদিনের ইফতার কেনা হয় চকবাজার থেকেই। তার ভাষায়, ৪০০ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এই বাজারে পুরান ঢাকার সব নামিদামি ও মুখরোচক ইফতার একসঙ্গে পাওয়া যায়। দাম যেমনই হোক, স্বাদ আর ঐতিহ্যের টানেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে।

আজিমপুর থেকে আসা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়–এর শিক্ষার্থী সুমাইয়ার রাইসা জানান, বিকাল থেকে এলেও প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে ভেতরে ঢোকা ও কেনাকাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও ঐতিহ্যবাহী ইফতার হাতে নেওয়ার আনন্দ আলাদা—এ অভিজ্ঞতা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।

চকবাজার এলাকার বাসিন্দা অপু সুলতান বলেন, প্রথম রোজায় পরিবার নিয়ে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ইফতার কিনে একসঙ্গে খাওয়ার আলাদা আবেগ আছে। লালবাগ শহীদনগর থেকে আসা মো. আনোয়ারের মতে, প্রথম দিনে কিছু পণ্যের দাম গতবারের তুলনায় সামান্য বেশি হলেও রমজানের শুরুতে এমনটা স্বাভাবিক; বাজারে সরবরাহ বাড়লে দামও স্থিতিশীল হবে।

মিরপুরের মোহাম্মদ গফুর চার বছর পর এসে জানান, আগের মতোই ভিড়, হাঁকডাক আর উৎসবের আমেজ রয়েছে। যাত্রাবাড়ী থেকে আসা সোলেমান বলেন, বাসায় মেহমান থাকায় যানজট পেরিয়ে এসেছেন; কিছু পণ্যের দাম একটু বেশি হলেও বেশিরভাগ আগের মতোই আছে, আর স্বাদের জন্যই এই কষ্ট সার্থক।

গুলশান নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা জুনায়েদ জানান, সাধারণত গুলশান থেকেই ইফতার কেনেন, তবে প্রথম রোজায় ঐতিহ্যের টানে এখানে এসেছেন। যানজট ও ভিড়ের ভোগান্তি থাকলেও পুরান ঢাকার ইফতারের বৈচিত্র্য ও স্বাদ অন্য কোথাও মেলে না। নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা মো. ইউসুফ বলেন, অনেক বছর পর এসে দেখলেন প্রথম দিনের হিসেবে দাম মোটামুটি স্বাভাবিক, তবে ভিড় অনেক বেশি—যা প্রমাণ করে, শত বছরের ঐতিহ্য আজও মানুষের আস্থা আর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।

উপসংহার: উৎসবের নাম চকবাজার

ঐতিহ্য, স্বাদ, হাঁকডাক আর মানুষের মিলনমেলায় রমজানজুড়ে চকবাজার যেন এক উৎসবের নাম। শতবর্ষের সেই ইফতার সংস্কৃতি আজও পুরান ঢাকার পরিচয় বহন করে—সময়ের স্রোত পেরিয়ে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। পুরান ঢাকার এই ঐতিহ্যবাহী ইফতার বাজার শুধু খাবারের জন্যই নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বন্ধনেরও প্রতীক হয়ে উঠেছে।