পয়লা ফাল্গুনে মুক্তির উৎসব: নির্বাচনের স্বস্তিতে মিলেছে বসন্তের রঙ
পয়লা ফাল্গুনে মুক্তির উৎসব: নির্বাচনের স্বস্তি

পয়লা ফাল্গুনে মুক্তির উৎসব: নির্বাচনের স্বস্তিতে মিলেছে বসন্তের রঙ

শনিবার পয়লা ফাল্গুনে ঢাকা শহর জেগে উঠেছিল এক ভিন্ন রূপে। বিকেলের দিকে বেরিয়ে শহর ঘুরতে গিয়ে দেখা গেল, এ যেন এক আরেক ফাল্গুন। গত কয়েক বছর ধরে পয়লা ফাল্গুনে বেরোনোর তেমন ইচ্ছা না হলেও এবার প্রবল আকর্ষণ কাজ করছিল। এর পেছনে মূল কারণ ছিল দুই দিন আগের একটি অনন্যসাধারণ নির্বাচন ও তার স্বস্তিকর ফল, যা একটি আনন্দময় আবহ তৈরি করেছিল। এই ‘বাংলাদেশ বসন্ত’কে উদযাপন করতে চাইছিলেন অনেকেই—বিপুলভাবে, ভিন্নভাবে।

শহরজুড়ে উৎসবের রঙ

সকালে যেতে না পারলেও বিকেলের দিকে শহরের নানান জায়গায় গানের জলসা, নাচের আসর দেখে উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলাম। বাইরে বেরিয়েই চোখে পড়ল পথে পথে আনন্দিত, উচ্ছল মানুষের সারি। মেয়েরা বাসন্তী কিংবা লাল শাড়িতে সেজেছেন, খোঁপায় গাঁদা বা পলাশের ফুল শোভা পাচ্ছিল। নারী পুলিশদের চুলেও দেখা গেল হলদে ফুলের সাজ। ছেলেরা পরেছিলেন রঙিন পাঞ্জাবি, আর শিশুরা হাতে নিয়ে ঘুরছিল রঙিন বেলুন। রাস্তাজুড়ে কলকলানি, উচ্চকিত হাসির শব্দ আর ভিড়—হাতিরঝিল, রমনা পার্ক, কার্জন হল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সামনে দেখা গেল মানুষের সমুদ্র।

মুক্তির উৎসব হিসেবে ফাল্গুন

দেখে মনে হলো, এবারের পয়লা ফাল্গুন শুধু উৎসবের ছিল না; এটি ছিল একটি মুক্তির উৎসব, শঙ্কামুক্ত স্বাধীনতার উদযাপন এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার হাতছানি। বহুকালের হারানো ভোটাধিকার মানুষ প্রয়োগ করতে পেরেছে সাম্প্রতিক নির্বাচনে—স্বাধীনভাবে, কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই। এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অতুলনীয়, যা মানুষকে মুক্তির স্বাদ দিয়েছে। পয়লা ফাল্গুনের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ তারই একটি প্রতিফলন বলে মনে হচ্ছিল।

নারীদের জন্য বিশেষ অর্থ

সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের ফলাফল একটি শঙ্কা ও ভীতির অস্বস্তি থেকে মুক্তি দিয়েছে, বিশেষত এ দেশের নারী সমাজের জন্য। নির্বাচনের আগে বেশ কিছু সময় ধরে নারীদের বিরুদ্ধে নানান অকথ্য কথন ও মধ্যযুগীয় ভাষ্য একটি ভয়ভীতির পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। তাঁরা আশঙ্কা করছিলেন যে আবার ধর্মতন্ত্রের বেড়ি পরানো হবে কি না। কিন্তু পয়লা ফাল্গুনের রঙিন উৎসব দেখে মনে হলো, সে অস্বস্তি অনেকটাই তিরোহিত হয়েছে। নানান বয়সের মেয়েদের শঙ্কাহীনচিত্তে স্বাধীনভাবে ঘুরতে দেখা গেল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এবং অন্যান্য অঙ্গনে। তাঁদের চোখেমুখে মুক্তির দীপ্তি ও স্বাধীনতার তৃপ্তি স্পষ্ট ছিল।

ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিফলন

উদারপন্থী পরিবেশ বাংলাদেশের সনাতন ঐতিহ্য। আমরা ধর্মপ্রাণ জাতি, কিন্তু ধর্মতন্ত্রকে কখনো গ্রাস করতে দিইনি। সেই ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সচেতন প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল ফাল্গুনের আনন্দোৎসবে, নাচে-গানে, শুভেচ্ছায় ও সৌহার্দ্যে। অনেকেই সপরিবারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে এসেছিলেন, মধুদার ক্যানটিনে, বটতলায়, অপরাজেয় বাংলার ভাস্কর্যের পাদদেশে সময় কাটিয়েছেন। ছেলেমেয়েদের গল্প শোনানো হচ্ছিল কলাভবনে, স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের দিন বা মুক্তিযুদ্ধের আলেখ্যের সামনে দাঁড়িয়ে।

চ্যালেঞ্জ ও অঙ্গীকার

তবে এটাও স্মরণে রাখতে হবে যে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে মাত্র ১০টি দল নারী প্রার্থী দিয়েছে। মোট প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৭৮ জন ছিলেন নারী, যা প্রায় ৩ শতাংশ। মাত্র সাতজন নারী নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। অনেক নারী প্রার্থী বলেছেন যে তাঁরা নিজেরাই লড়েছেন, দল থেকে পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা পাননি। এসব ঘটনাপ্রবাহ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে, উদারপন্থার সপক্ষে একটি সংহত অবস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। এই সুযোগ থেকে উদারপন্থাকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, বিজ্ঞানমনস্কতা, গঠনমূলক সমালোচনা, সহনশীলতা ও পরমতসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

এভাবেই পয়লা ফাল্গুনের উৎসব শুধু বসন্তের আগমনই নয়, বরং একটি মুক্তির বার্তা বহন করে নিয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনের স্বস্তি ও আশার আলোয় মিশে গিয়েছিল এই রঙিন উদযাপন, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন।