জ্যৈষ্ঠের হালকা মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। বৃষ্টিপরবর্তী কিছুটা ভ্যাপসা গরম। সকাল থেকেই প্রস্তুতির নানা কাজে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন বন্ধুসভার বন্ধুরা। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে আসতে শুরু করলেন সাহিত্য উৎসবে নিবন্ধন করা তরুণ লেখকেরা। ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তন। এরই মধ্যে ভেন্যুতে এলেন হালকা প্রিন্টের পাঞ্জাবি পরা ধবধবে সাদা চুলের হাসিমাখা একজন অতিথি। ফুল নিয়ে এগিয়ে তাঁকে বরণ করলেন বন্ধুসভার বন্ধুরা। মিলনায়তনে ঢুকতেই তিনি কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক বুঝতে পেরেই উচ্ছ্বাস আর করতালিতে মুখর হয়ে উঠল মিলনায়তন। এমনই উৎসবমুখর পরিবেশ ছিল পঞ্চগড় জেলা শিল্পকলা একাডেমি চত্বর। গত শনিবার এভাবেই শুরু হয়েছিল পঞ্চগড় বন্ধুসভা আয়োজিত ‘পঞ্চগড় সাহিত্য উৎসব ২০২৬’।
উৎসবের পরিবেশ
সময় গড়াতেই মিলনায়তনটি মুখর হয়ে ওঠে কবিতা, গল্প, আবৃত্তি, সংগীত, নৃত্য, বইপড়া আর লেখালেখির আলোচনায়। মঞ্চজুড়ে সাহিত্যচর্চার আহ্বান, দর্শকসারিতে তরুণ লেখক আর সুধীজনদের উচ্ছ্বাস—যেন আয়োজনজুড়ে তৈরি হয়েছিল সৃজনশীল আর সাংস্কৃতিক আবহ।
আনুষ্ঠানিক শুরু
সকাল ১১টার দিকে পঞ্চগড় বন্ধুসভার সদস্যদের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সাহিত্য উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর পঞ্চগড় প্রতিনিধি রাজিউর রহমান। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে প্রথম আলো বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি জাফর সাদিক, জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের উপদেষ্টা আশিকুজ্জামান অভি, মকবুলার রহমান সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ দেলওয়ার হোসেন প্রধান, পঞ্চগড় বন্ধুসভার উপদেষ্টা ও মকবুলার রহমান সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক রবিউল ইসলাম রফিক এবং পঞ্চগড়ের নুরজাহান হোটেল অ্যান্ড রেস্তোরাঁর স্বত্বাধিকারী মো. হায়াতুন আলম বক্তব্য দেন।
আনিসুল হকের বক্তব্য
প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক তরুণ লেখকদের উদ্দেশে বলেন, ‘লেখক হতে চাওয়াটা খুবই ভালো। সবাইকে লেখক হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু ভালো লেখা সবাইকে পড়তে হবে। ভালো লেখক হওয়ার জন্য আগে ভালো পাঠক হতে হবে।’ সাহিত্য উৎসবে ‘কী লিখব, কীভাবে লিখব’ শীর্ষক আলোচনায় আনিসুল হক এ কথা বলেন।
পাঠক থেকে লেখক হয়ে ওঠার গল্পের বিষয়ে আনিসুল হক বলেন, ‘একজন সাধারণ পাঠক বই পড়ে কখনো হাসেন, কখনো কাঁদেন, কখনো উত্তেজিত হন। কিন্তু একজন লেখক বই পড়েন ভিন্নভাবে। তিনি ভাবেন, কোন শব্দ, কোন বাক্য বা কোন বর্ণনা তাঁকে হাসালো কিংবা কাঁদালো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন বই পড়ে নানা অনুভূতির ভেতর দিয়ে যাই। কিন্তু লেখক পড়ে আবার ভাবেন, লাইনটি পড়ে আমি হাসলাম কেন, কাঁদলাম কেন, আমার রাগ হলো কেন। এই কায়দাটা শেখে।’
তরুণদের উদ্দেশে এই কথাসাহিত্যিক বলেন, ‘তাহলে আমরা পড়ব, প্রচুর পড়ব, ভালো বই পড়ব। প্রথমবার পড়ব পাঠক হিসেবে, দ্বিতীয়বার পড়ব লেখক হিসেবে। ভাবব, লেখক কীভাবে আমাকে কাঁদালেন বা উত্তেজিত করলেন।’
প্রতিযোগিতা ও বিজয়ীরা
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বইপড়া, লেখালেখি ও সাহিত্যচর্চায় আগ্রহ বাড়াতে এই সাহিত্য উৎসবের আয়োজন করে পঞ্চগড় বন্ধুসভা। বয়সভিত্তিক তিনটি বিভাগে মোট ২১২ জন অনলাইনে নিবন্ধন করেন। অংশগ্রহণকারীরা কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ জমা দেন। বিচারক প্যানেলের মাধ্যমে তিনটি বিভাগে মোট ছয়জনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। তাঁদের হাতে সনদ, ফুল, বই ও গাছের চারা তুলে দেওয়া হয়।
- ক বিভাগে (১২-১৫ বছর): কবিতায় বিজয়ী হয় ফাহমিদা হক এবং গল্প-প্রবন্ধে বিজয়ী হয় পুনশ্চ উপলব্ধি রায়।
- খ বিভাগে (১৬-২০ বছর): কবিতায় বিজয়ী হন এমএল রহমান এবং গল্প-প্রবন্ধে বিজয়ী হন সাথী রায়।
- গ বিভাগে (২১ বছর ও তদূর্ধ্ব): কবিতায় বিজয়ী হন লামইয়া আক্তার এবং গল্প-প্রবন্ধে বিজয়ী হন আনারুল ইসলাম।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কলেজছাত্রী সারা মাহজাবিন সাহিত্যচর্চায় অনন্য আগ্রহের স্বীকৃতি হিসেবে পান ‘অদম্য লেখক’ সম্মাননা।
সাংস্কৃতিক আয়োজন
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি উৎসবে ছিল সাংস্কৃতিক আয়োজনও। নৃত্য পরিবেশন করেন পঞ্চগড় বন্ধুসভার সদস্য সোহানা তুবা ও রাহাত বাবু। রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন তমালিকা রায়, আধুনিক গান পরিবেশন করেন ধনেশ চন্দ্র রায় এবং কবিতা আবৃত্তি করেন আফিয়া ইবনাত ইলা।
অনুষ্ঠানের এক আবেগঘন মুহূর্তে স্থানীয় চিত্রশিল্পী হাসনাত সোহাগ ১১ বছর আগে আঁকা আনিসুল হকের একটি প্রতিকৃতি তাঁর হাতে তুলে দেন।
সমাপনী
পঞ্চগড় বন্ধুসভার কার্যনির্বাহী সদস্য রায়হান শরীফের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্য ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সাধারণ সম্পাদক রেশমা রিয়া। নিবন্ধনের মাধ্যমে সাহিত্য উৎসবে অংশ নেওয়া সবার হাতে সনদ, ফুল ও উপহার তুলে দেওয়া হয়। আয়োজনের সার্বিক সহযোগিতায় ছিল পঞ্চগড়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নুরজাহান হোটেল অ্যান্ড রেস্তোরাঁ।



