মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে তিথিডোর ক্যাফে: বই ও সংগীতের মেলবন্ধন
মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে তিথিডোর ক্যাফে অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট দুই বছরে স্থানীয়দের নজর কেড়েছে অনন্য পরিবেশ ও সেবার মাধ্যমে। এখানে স্কুলফেরত কিশোর-কিশোরীরা ছোলে বাটুরে খাচ্ছে, পরিবারের সদস্যরা বিরিয়ানির ফাঁকে গান গাইছে, আর তরুণীরা বই পড়তে পড়তে অপেক্ষা করছে প্রিয়জনের জন্য। লাল-নীল, হলুদ-সবুজ বাতির আলোয় সাজানো এই ক্যাফেতে প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চলে মায়াবী আড্ডার খেলা।
বুক ক্যাফে ও মিউজিক্যাল আবহ
তিথিডোর শুধু একটি কফি শপ বা রেস্টুরেন্ট নয়, এটি একটি বুক ক্যাফেও বটে। অনেকে এটিকে মিউজিক্যাল ক্যাফে হিসেবেও ডাকেন। আশি ও নব্বই দশকের শহরতলির আবহে সজ্জিত অন্দরসজ্জা এখানকার অন্যতম আকর্ষণ। তিথিডোর শব্দের অর্থ সময়ের বন্ধন, যা বুদ্ধদেব বসুর একটি উপন্যাসের নামেও পরিচিত। তবে স্বত্বাধিকারী অনল রায়হান বলেন, নামটি উচ্চারণে মজা লাগে বলেই এটি বেছে নেওয়া হয়েছে।
অনল রায়হান মূলত ব্যবসায়ী নন, তাঁর কফি প্লেসে কাজ করার ইচ্ছা থেকেই এই উদ্যোগ। তিনি বলেন, ‘আমি কফি প্লেস খুব পছন্দ করি। একদিন দেখলাম, এই জায়গায় কফিশপের জন্য গ্যারেজ ভাড়া দেওয়া হবে, তারপর আর ভাবিনি।’ মিডিয়া, এনজিও, অ্যাডভারটাইজিং এজেন্সিতে কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও ক্যাফের কাজ তাঁকে নতুনভাবে উপভোগ করাচ্ছে।
দেয়াললিখন ও গ্রাহকদের অংশগ্রহণ
তিথিডোরের একটি মৌলিক দিক হলো দেয়াললিখন। দুই বছরে এখানে অসংখ্য মানুষের কথা, প্রেম, বিরহ, খেলা, রাজনীতি ও দর্শন লেখা হয়ে আছে দেয়ালে। পুরো ক্যাফের ডিজাইন অনল রায়হানের করা, যা তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে তুলেছেন। গ্রাহকরা এখানে বই পড়তে পারেন এবং বাড়িতেও কোনো ফি ছাড়াই বই নিয়ে যেতে পারেন, যা বুক ক্যাফে কনসেপ্টকে জীবন্ত রাখছে।
মজার বিষয় হলো, গ্রাহকরা কখনো কখনো অনল রায়হানের জন্য বিশেষ খাবার বা উপহার নিয়ে আসেন। একবার একটি রহস্যজনক প্যাকেজে ফুলের বুকে, জহির রায়হানের বই ও কাঠের ওপর লেখা ‘তিথিডোর’ শব্দটি এসেছিল, যা পরে একজন নিয়মিত গ্রাহকের পাঠানো বলে জানা যায়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও স্বপ্ন
তিথিডোরকে একটি পরিবেশবান্ধব ক্যাফে হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে অনল রায়হানের। তিনি সম্পূর্ণ নিরামিষাশী মেনু চালু করতে চান, যেখানে সবজি তাদের নিজস্ব খামার থেকে আসবে এবং বিদেশি সবজি ব্যবহার করা হবে না। ভবিষ্যতে সুন্দরবন বা বান্দরবানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছোট ছোট তিথিডোর শাখা স্থাপনেরও ইচ্ছা তাঁর, যেখানে স্থানীয় খাবার ও বই থাকবে, ঢাকা থেকে শুধু বই পাঠানো হবে।
অনল রায়হান স্বপ্ন দেখেন, একসময় তিথিডোর আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ শুরু করবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের চেয়ে বহু ভালো রেস্টুরেন্ট আছে, কিন্তু ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গ্রাহকরা নিয়মিত আসেন, আমি তার জন্য অশেষ কৃতজ্ঞ।’ এই সাধারণ ক্যাফেটি আজ মোহাম্মদপুরের একটি সাংস্কৃতিক মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে।
