কুড়িগ্রামে সম্পত্তি বিরোধে বাবার লাশ ৩০ ঘণ্টা আটকে রাখার মর্মান্তিক ঘটনা
কুড়িগ্রামে সম্পত্তি বিরোধে বাবার লাশ ৩০ ঘণ্টা আটকে

কুড়িগ্রামে সম্পত্তি বিরোধের জেরে বাবার লাশ ৩০ ঘণ্টা আটকে রাখার শোকাবহ ঘটনা

কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলায় সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে পারিবারিক বিরোধের তিক্ত পরিণতি হিসেবে এক বৃদ্ধ বাবার লাশ প্রায় ৩০ ঘণ্টা ধরে আটকে রাখা হয়েছিল। গতকাল বুধবার রাত ১১টার দিকে স্থানীয় মুরব্বি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় স্ট্যাম্পে লিখিত একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর অবশেষে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি নাগেশ্বরী পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পয়রাডাঙ্গা বাজার এলাকায় সংঘটিত হয়েছে, যা এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

বিরোধের পটভূমি ও জানাজা স্থগিত হওয়ার ঘটনা

স্থানীয় সূত্র থেকে জানা যায়, আজিজার রহমান নামের ৭৫ বছর বয়সী ব্যক্তি গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান। পরের দিন বুধবার বেলা ১১টায় তাঁর জানাজা অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারণ করে এলাকায় মাইকিং করা হয়েছিল। কিন্তু প্রথম স্ত্রী ও দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের কারণে নির্ধারিত সময়ে জানাজা অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। পারিবারিক সূত্রে প্রকাশ, আজিজার রহমান জীবদ্দশায় তাঁর বাড়িভিটাসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দ্বিতীয় স্ত্রীর ছেলে রফিকুল ইসলাম ওরফে টাইগারের নামে লিখে দিয়েছিলেন, যা নিয়ে প্রথম পক্ষের ছেলে আবদুল হাকিমের সঙ্গে বিরোধ চলছিল।

বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জানাজায় অংশ নিতে এলাকাবাসী জড়ো হলে, হাকিম সম্পত্তির সমবণ্টন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে দাফনে আপত্তি তোলেন। এই ঘটনার জেরে জানাজা স্থগিত হয়ে যায় এবং মরদেহ কাফন পরানো অবস্থায় বাড়ির আঙিনায় খাটিয়ায় রাখা ছিল প্রায় ৩০ ঘণ্টা ধরে। দিনভর স্থানীয় মুরব্বি, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিরা দুই পক্ষকে নিয়ে একাধিক দফায় বৈঠক করেন, কিন্তু সন্ধ্যার পরও কোনো সমাধান না হওয়ায় পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্বস্তিকর ও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সমঝোতা চুক্তি ও দাফন সম্পন্ন

অবশেষে রাত ১০টার দিকে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে একটি সালিশ বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সমঝোতা অনুযায়ী, বসতভিটার ২১ শতাংশ জমির মধ্যে দুই ভাই ৮ শতাংশ করে পাবেন এবং অবশিষ্ট অংশ বোনের প্রাপ্য হিসাবে থাকবে। পাশাপাশি, আবাদি জমি আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সুষ্ঠু তদারকির মাধ্যমে বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই বিষয়ে স্ট্যাম্পে লিখিত একটি অঙ্গীকারনামা সম্পাদন করা হয় এবং এতে উভয় পক্ষ স্বাক্ষর করে। সমঝোতা হওয়ার পর রাত ১১টার দিকে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং পারিবারিক কবরস্থানে আজিজার রহমানের দাফন সম্পন্ন করা হয়।

এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মন্তব্য

এই ঘটনাটি এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, অনেকেই দাফনে বিলম্বের ঘটনায় গভীর দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, "জমিসংক্রান্ত বিষয় পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যেত। জন্মদাতা বাবার মরদেহ ৩০ ঘণ্টা ফেলে রেখে দাফনে দেরি করা অমানবিক ও নৈতিকতাবিরোধী কাজ।" মৃত ব্যক্তির সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে নাগেশ্বরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল্লা হিল জামান বলেন, "এ ঘটনায় থানায় কেউ কোনো অভিযোগ করেননি, তাই বিষয়টি আমার জানা নেই।"

এই ঘটনা সম্পত্তি বিরোধের জটিলতা এবং পারিবারিক সংঘাতের ভয়াবহ দিকগুলো উন্মোচিত করেছে, যা সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের প্রশ্ন তুলে ধরছে। স্থানীয় সম্প্রদায় এখন শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে পাওয়ার আশা করছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে।