৫৫ বছরের দাম্পত্য জীবনের রহস্য: গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরীর প্রেম ও বিয়ের গল্প
গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরীর ৫৫ বছরের দাম্পত্য জীবনের গল্প

৫৫ বছরের দাম্পত্য জীবনের রহস্য: গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরীর প্রেম ও বিয়ের গল্প

অ্যাডকমের চেয়ারম্যান গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী ও নাজিম কামরান চৌধুরীর দাম্পত্য জীবন সুখের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ৫৫ বছর আগের জীবনে ফিরে গিয়ে তিনি শোনান তাঁর প্রেম ও বিয়ের দিনগুলোর গল্প। গল্পচ্ছলে এটাও জানান যে এই বয়সে এসে অনেক কিছুই ঠিকমতো মনে করতে পারেন না, কিন্তু প্রেমের স্মৃতিগুলো এখনও জ্বলজ্বল করছে।

প্রেমের শুরু: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি

১৯৬৫ বা ১৯৬৬ সালের কথা, তখন গীতিআরা সাফিয়া দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষে পড়তেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের জন্য কঠোর নিয়ম ছিল: ছেলেদের সঙ্গে প্রকাশ্যে কথা বলা যাবে না, একসঙ্গে বসা তো দূরের কথা। ছেলেরা বসত পেছনে, মেয়েরা সামনের বেঞ্চে। কিন্তু গীতিআরা বলেন, ‘আমরা ছিলাম একমাত্র ব্যাচ যারা এসব নিয়ম মানতেন না। কিছুটা দুষ্টু ছিলাম বলা চলে।’

নাজিম কামরান চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়েই, যিনি পড়তেন পলিটিক্যাল সায়েন্সে। গীতিআরা ফ্রেঞ্চ ক্লাসে ভর্তি হন, এবং সেখানেই ক্লাস করতে গিয়ে পরিচয়, চেনাজানা ও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ফ্রেঞ্চ ক্লাসের এক পিকনিকে গিয়ে নাজিম কামরান চৌধুরী প্রথম তাঁর ভালো লাগার কথা জানান। গীতিআরারও তাকে ভালো লাগত, তাই তিনি হ্যাঁ বলে দেন।

তখনকার দিনে প্রেম করাটাকে খারাপ চোখে দেখা হতো, তাই গোপনে দেখা করতেন দুজন। ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস, ফ্রেঞ্চ ক্লাস বা লাইব্রেরিতে এভাবেই ভালোবাসার সম্পর্ক তিন-চার বছরে গড়ে ওঠে। দুই পরিবারের সদস্যরাও জানতে পারেন তাঁদের সম্পর্কের কথা, এবং হবু শ্বশুর আবদুল মুনিম চৌধুরী ফল নিয়ে দেখা করতে আসেন।

বিয়ের প্রস্তাব ও দেনমোহরের অনন্য ঘটনা

গীতিআরার আব্বা এ এফ এম সফিয়্যুল্লাহ প্রথম দিকে সবকিছুতেই নেতিবাচক ভাব দেখালেও বিয়ের দু-একদিন আগে এক অদ্ভুত কাজ করে বসেন। বিয়েতে দেনমোহর এক লাখ টাকা ধার্য করা হলে তিনি বাদ সাধেন। সবাই ভেবেছিলেন দেনমোহরের টাকা কম হওয়ায় তিনি এমন করছেন, কিন্তু তিনি সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলেন, ‘এই বিয়েতে কোনো দেনমোহর দিতে হবে না।’

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘যে বিয়েতে বিশ্বাস নেই, আস্থা নেই, ভালোবাসা নেই, সেখানে দেনমোহরের দরকার হয়। কিন্তু আমার মেয়ে এই ছেলেকে বিশ্বাস করে ভালোবেসেছে, সেখানে দেনমোহরের কী দরকার? আমি এই বিয়েতে মত দিয়েছি শুধু ওদের ভালোবাসা দেখে।’ এই কথায় আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন গীতিআরা, এবং তাঁর বিশ্বাস সত্যি হয়: ৫৫ বছরের বিবাহিত জীবনে তাঁরা সুখে কাটিয়েছেন।

বিয়ের আয়োজন ও নতুন জীবন

১৯৬৯ সালের ২৬ এপ্রিল শাহবাগ হোটেলে (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। গীতিআরা লাল বেনারসি শাড়ি পরেন, এবং ভারী গয়না পরার রেওয়াজ মেনে চলেন। বাড়ির বোন বা ভাবিদের মধ্যে যাঁদের সাজানোর হাত ভালো ছিল, তাঁরাই তাঁকে কনে সাজান। নাজিম কামরান চৌধুরী শেরওয়ানি পরে বর সাজেন।

বিয়ের পর হানিমুনে শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে যান তাঁরা। গীতিআরা বলেন, ‘আমার শাশুড়ি, যাকে আমি মা বলে ডাকতাম, তিনি চাইতেন আমরা খুব সুন্দর দাম্পত্য জীবন কাটাই। বিয়ের পরদিন পূর্ণিমার রাতে তিনি বেলি ফুল দিয়ে মালা গেঁথে আমার খোঁপায় জড়িয়ে দেন, এবং নাজিম কামরানের সঙ্গে হুডখোলা রিকশায় ঘুরে আসতে বলেন।’

দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের রহস্য

এই দীর্ঘ দাম্পত্যে তাঁদের দুজনের ঝগড়া হয়নি, তা নয়, কিন্তু মনোমালিন্য দীর্ঘক্ষণ পুষে রাখেননি। একজন আরেকজনকে ছাড় দিয়েছেন। গীতিআরা বলেন, ‘এটা সম্ভব হয়েছে অভিভাবকদের জন্য। তাঁরা আমাদের মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টি শিখিয়েছিলেন। মানুষে দোষ থাকবেই, সবকিছু মনের মতো হবে না—এই শিক্ষাগুলোই আমাদের দাম্পত্যকে মসৃণ করেছে। আমরা হয়েছি একে অপরের পরিপূরক।’

নাজিম কামরান চৌধুরী কিছুটা আত্মভোলা, কিন্তু গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরীর খেয়াল রাখতেন। ভালোবাসা প্রদর্শনের বিষয়টি নাজিম কামরানের মধ্যে সরাসরি না থাকলেও তিনি গোপনে যত্ন নিতেন। একবার ভারতে বেড়াতে গিয়ে শাড়ি কেনার সময় তিনি দুটো শাড়িই কিনে দেন, যা গীতিআরাকে মুগ্ধ করে।

দুই সন্তান—নাজিম ফারহান চৌধুরী ও ফাহিমা চৌধুরী—এবং এক নাতিকে নিয়ে এখন তাঁদের ভরপুর সংসার। ৫৫ বছরের এই দাম্পত্য জীবন শুধু দুজনের ভালোবাসার নয়, দুই পরিবারের সমর্থন ও পারিবারিক শিক্ষার ফল। গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরীর গল্প প্রমাণ করে, বিশ্বাস ও আস্থাই দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের মূল চাবিকাঠি।