আনবক্সিং ভিডিও: কেন আমরা বক্স খোলার মুহূর্ত দেখতে ভালোবাসি?
একটি কাগজের বক্স হাতে বসে আছে এক কিশোর। হাতে কাঁচি। ধীরে ধীরে কেটে ফেলা হচ্ছে শক্ত আঠালো টেপ। মৃদু শব্দ কানে আসছে। কিশোর মুখে মুখে ধারাভাষ্য দিচ্ছে। ধীরে ধীরে খোলা হলো বক্সের ঢাকনা। প্রথমে এক পাশ কাটা হলো, তারপর আরেক পাশ। পুরো প্রক্রিয়ার ভিডিও সম্প্রচারিত হচ্ছে। শত শত দর্শক দেখছে আনবক্সিং ভিডিও। একসময় বক্সে হাত ঢুকিয়ে কিশোরটি বের করে আনল ভেতরে রাখা একটি জিনিস।
এ দৃশ্য এখন খুব পরিচিত। বক্স খোলার ভিডিও এখন ব্যাপক জনপ্রিয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কেন এগুলো দেখি? কেন আমাদের বক্স খুলতে বা আনবক্সিং করতে ভালো লাগে? আসলে আমরা বেশির ভাগ সময় দেখি কীভাবে খোলা হচ্ছে। একটা টান টান উত্তেজনা থাকে। এই অনুভূতির পেছনে আছে লাখ লাখ বছর আগের মানুষের জীবনের ঘটনা।
প্রাচীন কৌতূহল ও ভালো লাগার রাসায়নিক
প্রাচীনকালে মানুষের জন্য কোনো হাটবাজার ছিল না, যেখানে ইচ্ছেমতো গিয়ে খাবার কিনে আনা যায়। তখন বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে খুঁজে বের করতে হতো খাবার আর পানির উৎস। সেই খোঁজ চালিয়ে যাওয়ার শক্তি দিত মস্তিষ্কের একটি বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ। যাকে আমরা বলি ‘ভালো লাগার অনুভূতির রাসায়নিক’। এই পদার্থ মানুষকে কাজ চালিয়ে যেতে সাহায্য করত। পাহাড় পেরিয়ে, জঙ্গল পেরিয়ে, নতুন কিছু খুঁজে পেতে ভূমিকা রাখত।
মজার বিষয় হলো, এ আনন্দ মূলত পাওয়া যায় খোঁজার প্রক্রিয়ায়। শেষে কী জিনিস পেলাম, সেটা আসল নয়। ঠিক এ কারণেই আমরা বক্স খোলার মুহূর্তটি দেখতে বেশি আনন্দ পাই ভেতরের জিনিস দেখার চেয়ে।
নতুন কিছুর প্রতি আকর্ষণ ও কৌতূহল
মানুষের আরেকটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো নতুন কিছুর প্রতি আকর্ষণ। ছোট্ট শিশুরা যেমন চারপাশের সবকিছু জানতে চায়, দেখতে চায়, ছুঁতে চায়, তেমনই আমরা বড় হয়েও নতুন কিছু জানার আগ্রহ হারাই না। এই কৌতূহল আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায়। নতুন কিছু আবিষ্কার করতে শেখায়। সমাজকে বদলাতে সাহায্য করে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে চার্লস ডারউইন তাঁর বিবর্তনবিষয়ক গ্রন্থে লিখেছিলেন, কৌতূহল জীবের বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে। পরে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই কৌতূহলের সঙ্গেও সেই ‘ভালো লাগার’ রাসায়নিকের গভীর সম্পর্ক আছে। নতুন কিছু দেখলে আমাদের মনোযোগ বাড়ে, আমরা আরও আগ্রহী হয়ে উঠি। যেমন প্রাচীন মানুষ নতুন কিছু দেখে বুঝতে চাইত, এটি কি খাবার, নাকি বিপজ্জনক কিছু? এখন সেই একই কৌতূহল মেটাতে আমরা দেখি, অন্য কেউ নতুন কোনো জিনিসের বক্স খুলছে।
অন্যের অনুভূতিতে অংশগ্রহণ
আরেকটি অদ্ভুত অনুভূতির কথাও বলা যায়। কেউ যখন ধীরে ধীরে মোড়ক ছেঁড়ে, নরম কাগজ খুলে কিছু বের করে, তখন মনে হয় আমি নিজেই যেন সেটা ছুঁয়ে দেখছি। কেউ যখন বক্স খুলে আনন্দে চিৎকার করে ওঠে, তখন আমাদেরও ভালো লাগে।
এর পেছনে কাজ করে আমাদের মস্তিষ্কের কিছু বিশেষ কোষ। এগুলো এমনভাবে কাজ করে যে আমরা নিজেরা কিছু অনুভব করলে যেমন প্রতিক্রিয়া হয়, অন্য কাউকে সেই কাজ করতে দেখলেও একই প্রতিক্রিয়া হয়। এ কারণেই আমরা অন্যের আনন্দে আনন্দ পাই, দুঃখে দুঃখ পাই। আর এ অনুভূতিই আমাদের একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করে।
একসঙ্গে অনেক কিছু পাওয়ার তৃপ্তি
এই বক্স খোলার ভিডিওর আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো একসঙ্গে অনেক কিছু পাওয়ার দৃশ্য। অতীতে মানুষ শীতের সময়ের জন্য খাবার জমিয়ে রাখত। কারণ, তখন খাবার পাওয়া কঠিন ছিল। সেই সময়ের অভ্যাস এখনো আমাদের ভেতরে কোথাও রয়েছে গেছে। তাই যখন আমরা দেখি কেউ একসঙ্গে অনেক জিনিসের সংগ্রহ দেখাচ্ছে, খেলনা, প্রসাধনী বা অন্য কিছু, তখন আমাদের মনে একধরনের নিরাপত্তা আর তৃপ্তির অনুভূতি তৈরি হয়।
সব মিলিয়ে ছোট্ট একটি বক্স খুলে দেখার মধ্যে লুকিয়ে আছে মানুষের হাজার বছরের পুরোনো অভ্যাস ও অনুভূতি। এটি শুধু একটি ভিডিও নয়, বরং আমাদের মনস্তাত্ত্বিক ইতিহাসের একটি অংশ।



