তালগাছ রোপণে জোর দিন, পরিবেশ ও ঐতিহ্য বাঁচান
তালগাছ রোপণে জোর দিন, পরিবেশ ও ঐতিহ্য বাঁচান

ভাদ্রের দুপুরে মাঠের ওপাশ থেকে ভেসে আসা ধুপ শব্দ—পাকা তাল মাটিতে পড়ার সেই চেনা সংগীত এখন গ্রামবাংলায় কম শোনা যায়। একসময় শিশুরা দৌড়ে তাল কুড়াতে যেত, বিকেলে বড় থালায় বের হতো পাকা তালের শাঁস, আর সন্ধ্যায় রান্নাঘরে শুরু হতো তালের বড়া, পিঠা, ক্ষীর কিংবা পায়েস তৈরির আয়োজন। আজ সেই শব্দ ও গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়ায় না বললেই চলে।

বাংলার প্রকৃতি নিঃশব্দে বদলে যাচ্ছে। শুধু নদীর গতিপথ নয়, বদলে যাচ্ছে গ্রামের আকাশরেখাও। যে তালগাছ একসময় মাঠের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে জানিয়ে দিত ‘সামনেই একটি গ্রাম’, সেই তালগাছ এখন অনেক এলাকায় খুঁজে পাওয়াই কঠিন। পুরোনো গাছগুলো একে একে ঝরে পড়ছে, কিন্তু নতুন গাছ আর তেমন লাগানো হচ্ছে না। এই পরিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ জীবনের দীর্ঘ ঐতিহ্য, পরিবেশগত সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া প্রাকৃতিক উত্তরাধিকার।

ধীরগতির গাছের প্রতি দ্রুতগতির সমাজের অনীহা

তালগাছের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো তার ধীর জীবনচক্র। আজ একটি তালবীজ মাটিতে পুঁতলে আগামী বছর ফল মিলবে না; অনেক ক্ষেত্রেই এক দশকের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়। আধুনিক কৃষি অর্থনীতি, যেখানে দ্রুত ফলন আর তাৎক্ষণিক মুনাফাই প্রধান বিবেচনা, সেখানে তালগাছ স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে পড়েছে। অথচ যে গাছটি একবার বড় হয়ে উঠলে প্রায় এক শতাব্দী কিংবা তারও বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে, বছরের পর বছর ফল দেয়, খুব বেশি পরিচর্যা চায় না এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের কাজে আসে, সেই গাছকে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাংলাদেশে প্রতিবছর কোটি কোটি চারা রোপণের কথা বলা হয়। সামাজিক বনায়ন, সড়ক বনায়ন কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে বিদেশি ও দ্রুতবর্ধনশীল প্রজাতির আধিপত্য চোখে পড়ে। সেখানে তালগাছ খুব কমই জায়গা পায়। ফলে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে—বনায়নের পরিসংখ্যান বাড়ছে, কিন্তু বাংলার নিজস্ব ভূদৃশ্যকে চিহ্নিত করা দেশীয় বৃক্ষগুলো ক্রমে কমে যাচ্ছে।

শুধু ফলের গাছ নয়

তালগাছকে যদি শুধু ভাদ্র মাসের একটি ফলের উৎস হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তার প্রতি অবিচার করা হবে। বৈজ্ঞানিক নাম Borassus flabellifer দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাম–জাতীয় বৃক্ষ। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডে শত শত বছর ধরে এই গাছ মানুষের খাদ্য, বাসস্থান, কুটিরশিল্প ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তালের কচি শাঁস গরমের জনপ্রিয় খাদ্য। পাকা ফল দিয়ে তৈরি হয় বড়া, পিঠা, ক্ষীর, পায়েস, জ্যাম, জেলি ও নানা ধরনের মিষ্টান্ন। ভোরের তালরস থেকে তৈরি হয় গুড়, যা একসময় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ছিল। তালপাতা দিয়ে বানানো হতো হাতপাখা, চাটাই, ছাউনি, ঝুড়ি এমনকি বই লেখার পুঁথিও। শক্ত কাণ্ড ব্যবহৃত হতো ঘরের খুঁটি, সাঁকো ও নৌঘাট নির্মাণে। অর্থাৎ তালগাছ ছিল জীবনব্যবস্থার অংশ।

কৃষিবিদেরা বলেন, দীর্ঘজীবী দেশীয় বৃক্ষের মধ্যে তাল অন্যতম। একবার প্রতিষ্ঠিত হলে খুব কম পরিচর্যাতেই এটি টিকে থাকতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে, যখন খরা, অতিবৃষ্টি ও তাপমাত্রার ওঠানামা বাড়ছে, তখন এমন সহনশীল দেশীয় বৃক্ষের গুরুত্ব আরও অনেক বেশি। কিন্তু প্রশ্ন হলো সেই গুরুত্বটা কি আমরা অনুভব করতে পারছি?

কেন এখনই তালগাছ রোপণের সময়

বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণের সবচেয়ে অনুকূল সময় বর্ষাকাল। আষাঢ় থেকে ভাদ্র—এই তিন মাসে প্রকৃতি নিজেই চারার অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে। মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকে, বৃষ্টির পানি নতুন শিকড় গজাতে সাহায্য করে, সেচের প্রয়োজন কমে যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরও ফলদ ও দীর্ঘজীবী বৃক্ষ বর্ষাকালে রোপণের পরামর্শ দিয়ে থাকে। তালগাছের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়।

তবে তাল রোপণের গুরুত্ব ঋতুর কারণে নয়; সময়ের কারণেও। বাংলাদেশ এখন এমন একসময় পার করছে, যখন জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘ তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, বজ্রপাত, নদীতীরের ক্ষয়—সব মিলিয়ে দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে। এ বাস্তবতায় স্থানীয় পরিবেশে অভিযোজিত দেশি বৃক্ষের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। তালগাছ সেই দেশি প্রজাতিগুলোর অন্যতম।

তালগাছের আরেকটি বড় শক্তি এর সহনশীলতা। বেলে, দোআঁশ কিংবা মাঝারি এঁটেল—বিভিন্ন ধরনের মাটিতেই এটি বেড়ে উঠতে পারে। একবার শিকড় প্রতিষ্ঠিত হলে তুলনামূলক কম পানিতেও টিকে থাকে। প্রবল বাতাসেও সহজে ভেঙে পড়ে না। দীর্ঘ জীবনচক্রের কারণে বহু বছর ধরে কার্বন ধারণ করে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রাকৃতিকভাবে সহায়ক।

একটি বীজ, একটি ভবিষ্যৎ

তালগাছ রোপণের শুরু একটি ভালো বীজ নির্বাচন দিয়ে। ভাদ্র বা আশ্বিনে সম্পূর্ণ পাকা, রোগমুক্ত ও পরিণত ফল সংগ্রহ করতে হবে। স্বাভাবিকভাবে ঝরে পড়া ফল সাধারণত অধিক পরিপক্ব হয়। ফলের শাঁস পরিষ্কার করে শক্ত বীজ ছায়ায় দু-তিন দিন শুকিয়ে নিতে হয়। এরপর বেলে বা দোআঁশ মাটিতে বীজ আড়াআড়িভাবে পুঁতে রাখতে হয়। মাটি সব সময় আর্দ্র রাখতে হবে, তবে জলাবদ্ধতা যেন না হয়। তালের বীজ অঙ্কুরিত হতে ধৈর্য দরকার—দুই থেকে চার মাসের মধ্যে অঙ্কুর বের হতে পারে, আবার পরিবেশভেদে আরও বেশি সময়ও লাগতে পারে। এ সময় অনেকেই ভুল করে বীজ নষ্ট হয়েছে ভেবে ফেলে দেন। অথচ তালের প্রকৃতি ধীর—এটাই তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। চারা ছয় মাস থেকে এক বছর বয়সী হলে স্থায়ী জমিতে রোপণ করা সবচেয়ে ভালো।

কোথায় লাগাবেন?

তালগাছ এমন জায়গায় লাগানো উচিত, যেখানে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পৌঁছায়। রাস্তার ধারে, খালপাড়ে, বিলের উঁচু পাড়ে, বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার মাঠে, ইউনিয়ন পরিষদের খোলা জায়গায়, চরাঞ্চলের উঁচু জমিতে কিংবা বাড়ির সীমানায় তাল ভালো জন্মায়।

রোপণের আগে প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতার গর্ত তৈরি করে তাতে পচা গোবর বা কম্পোস্ট মিশিয়ে কয়েক দিন রেখে দিলে মাটির উর্বরতা শক্তি বাড়ে। গাছ থেকে গাছের দূরত্ব অন্তত ১০ থেকে ১২ মিটার হওয়া উচিত। কারণ, পূর্ণবয়স্ক তালগাছের মুকুট বিস্তৃত হয় এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের প্রয়োজন হয়। প্রথম দুই থেকে তিন বছর নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করা, প্রয়োজনে সেচ দেওয়া এবং গবাদিপশু থেকে চারা রক্ষা করাই মূল পরিচর্যা। এরপর তালগাছ নিজের শক্তিতেই বেড়ে ওঠে।

পরিবেশ রক্ষক

তালগাছ পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত সম্পদ। এর বিস্তৃত পাতা বহু পাখির নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করে। বাবুই, শালিক, দোয়েলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি তালগাছে বাসা বাঁধে। বাদুড় ও নানা ধরনের উপকারী পতঙ্গও এই গাছের সঙ্গে একটি প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলে। ফলে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও তালগাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে দীর্ঘজীবী বৃক্ষ হিসেবে বছরের পর বছর বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে কাঠ ও জীবদেহে সঞ্চিত রাখে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এ ধরনের দীর্ঘস্থায়ী কার্বন ভান্ডার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তালের আর্থিক মূল্যও কম নয়। কচি তালশাঁস, পাকা ফল, তালের রস, তালগুড়, তালের পিঠা, মোরব্বা, জ্যাম, জেলি—সব মিলিয়ে সম্ভাবনাময় গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে। তালপাতা দিয়ে এখনো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাতপাখা, চাটাই, ঝুড়ি, টুপি ও নানান কুটিরশিল্পের পণ্য তৈরি হয়। অর্থাৎ একটি গাছ একই সঙ্গে খাদ্য, কর্মসংস্থান ও সংস্কৃতির বাহক।

নদীভাঙন রোধে তালগাছের ভূমিকা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কথা খুব বেশি শোনা যায়—তালগাছ নাকি নদীভাঙন পুরোপুরি রোধ করতে পারে। বাস্তবতা অবশ্য আরও সংযত। গবেষণায় দেখা গেছে, তালগাছের গভীর ও শক্তিশালী শিকড় স্থানীয়ভাবে মাটিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে খালপাড়, পুকুরপাড়, ছোট নদীর ঢাল, রাস্তার উঁচু বাঁধ কিংবা চরাঞ্চলের অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল মাটিতে ক্ষয় কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বৃষ্টির পানিতে ওপরের স্তরের মাটি ধুয়ে যাওয়ার প্রবণতাও কিছুটা কমে। কিন্তু পদ্মা, যমুনা কিংবা মেঘনার মতো বৃহৎ নদীর ভাঙন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। সেখানে তীব্র স্রোত, নদীতলের পরিবর্তন, পলি সঞ্চয় ও হাইড্রোলিক চাপ একসঙ্গে কাজ করে। এ ধরনের ভাঙন শুধু গাছ লাগিয়ে থামানো যায় না। নদীবিশেষজ্ঞদের মতে, বড় নদীর তীর রক্ষায় প্রয়োজন প্রকৌশলভিত্তিক প্রতিরক্ষা, নদী ব্যবস্থাপনা এবং উপযুক্ত দেশীয় উদ্ভিদের সমন্বিত ব্যবহার। অর্থাৎ তালগাছকে অলৌকিক সমাধান হিসেবে নয়; বরং প্রকৃতিনির্ভর ভূমি ও তীর ব্যবস্থাপনার একটি সহায়ক উপাদান হিসেবে দেখা উচিত।

তালগাছের মূল্য আসলে অনেক—যেমন খাদ্য দেয়, তেমনি ছায়া দেয়; যেমন মানুষের উপকার করে, তেমনি পাখিরও আশ্রয় হয়; যেমন গ্রামীণ অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও বিষম ভূমিকা রাখে। এ কারণেই বর্ষার প্রতিটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে তালগাছের জন্য একটি বিশেষ স্থান থাকা উচিত। আসুন পরিকল্পনাভিত্তিক তালগাছ রোপণ করে পরিবেশ, ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্যের হেফাজত করি।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশ গ্রিন ইনিশিয়েটিভ