জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ফুটেছে দুর্লভ রক্তন ফুল, প্রকৃতির অপূর্ব শিল্পকর্ম
জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ফুটেছে দুর্লভ রক্তন ফুল

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ফুটেছে দুর্লভ রক্তন ফুল

প্রকৃতির অপূর্ব শিল্পকর্ম রক্তন ফুল সম্প্রতি ফুটেছে মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে। প্রথম দেখাতেই এই ফুলটি দর্শনার্থীদের মনে জাগিয়েছে উত্তেজনা, উচ্ছ্বাস, বিস্ময় ও কৌতূহল। ছোট্ট ফুলের বিশাল ফল এবং গাছের পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছে।

বসন্তের সকালে উদ্ভিদ উদ্যানে ভ্রমণ

এ বছরের ৬ চৈত্র বসন্তের সকালে আটজন প্রকৃতিবন্ধু মিলে গিয়েছিলেন মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের গাছপালা দেখতে। সুদৃশ্য জালিয়াডাঙ্গা লেক পাশ কাটিয়ে তারা ঢুকে পড়েন জঙ্গলের মধ্যে। পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটি গাছের কাছে দাঁড় করান বন্ধু জিয়া উল আলম চৌধুরী। তিনি জানান, এটিই সেই রক্তনগাছ। আগেই তিনি অবহিত করেছিলেন যে বোটানিক্যালে রক্তন, কইনার ও মোগলমণি ফুল ফুটেছে। রং বদলানো কইনার ফুল আগে দেখা গেলেও রক্তন ফুল কখনো দেখা হয়নি, তাই এর আকর্ষণেই মূলত সেখানে যাওয়া।

রক্তন ফুলের অপূর্ব রূপ ও বৈশিষ্ট্য

গাছের তলায় কুড়িয়ে পাওয়া রক্তন ফুল দেখে চোখ তুলে ওপরে তাকালে দেখা যায় মোটা থামের মতো খসখসে গুঁড়ি ও ধূসর বাদামি কাণ্ড। পাতাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে খুঁজতে লাগলেন ফুল। বেশ ওপরে শাখায়িত পুষ্পমঞ্জরিতে ফুলের দেখা মিলল, কিন্তু অত ওপরে সম্পূর্ণ চেহারা দেখা সম্ভব নয়। তাই নিচে কুড়িয়ে পাওয়া ফুলগুলো দেখে তার রূপের সবটুকু বোঝার চেষ্টা করা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফুলগুলো দুই রকমের: একটি সাজু বা সদ্য ফোটা, অন্যটি বাসি। সাজু ফুল বাসি হলে গাঢ় রক্তলাল হয়ে যায়। ফুলগুলো অনেকটা মেয়েদের নকশাদার কানপাশার মতো। সদ্য ফোটা ফুলের পাপড়ি পাঁচটি হলদে সাদা ও কুঞ্চিত, মাঝখানে ছোট্ট রক্তিম চাকতিসদৃশ কাঠামোর কেন্দ্রস্থলে গর্ভাশয় ও স্ত্রীকেশর রয়েছে। এটি ঘিরে পাহারা দিচ্ছে গমের দানার মতো হালকা গোলাপি রঙের পাঁচটি পরাগধানী। পুরুষ কেশরের পরাগদণ্ড হলদে সবুজ, পরাগধানীর গোড়া সবুজাভ। বোঁটা সবুজ, পাশেই ছোট্ট ডিমের মতো সবুজ কুঁড়ি। সব মিলিয়ে শিল্প, সৌন্দর্য, নকশা ও বর্ণের এক অপূর্ব কম্পোজিশন।

ফুলের রূপ বদল ও নামকরণ

পাপড়িগুলো খসে পড়ার পর ফুলটির চেহারা হয়ে যায় মেরুন লাল; বৃতি, কেশর ও কেশরস্তম্ভ সবই লাল। তখন ফুলটি যেন শুকিয়ে আসা রক্তের কণা। এ কারণেই হয়তো এ গাছের বাংলা নাম রাখা হয়েছে রক্তন, অন্য নাম ‘সুতরঙ্গা’। বইপত্রে এর ইংরেজি নাম ‘Frilly Crest-Petal’, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Lophopetalum wightianum ও গোত্র Celastraceae।

রক্তনগাছের বৈশিষ্ট্য ও সংকট

রক্তন একটি বৃহদাকার বৃক্ষ। গাছ ৬০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, কাণ্ডের বেড় হয় ১৯৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত। বয়স বাড়লে কখনো কখনো গাছের গোড়ায় কৃষ্ণচূড়াগাছের মতো অধিমূল দেখা যায়। গাছের বাকল পুরু, ধূসর বাদামি ও ফাটা ফাটা দাগযুক্ত। পাতা সরল, সাধারণত বিপরীতমুখীভাবে থাকে। পাতার বোঁটা এক থেকে আড়াই সেন্টিমিটার লম্বা ও গোলাকার, পাতা প্রায় ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। ফুল আকর্ষণীয়, পুষ্পমঞ্জরি ১২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। ফুলের পাপড়িগুলো হলুদাভ, চাকতি উজ্জ্বল লাল, প্রতিটি পাপড়িতে একটি চূড়া থাকে। এ জন্যই এর ইংরেজি নামকরণ করা হয়েছে ‘ফ্রিলি ক্রেস্ট পেটাল’।

ফুলের সৌন্দর্য দেখে আচ্ছন্ন থাকার সময় ক্যাপ্টেন কাওসার মোস্তফা একটি ফল কুড়িয়ে নিয়ে আসেন। ফলটা শক্ত, অনেকটা কামরাঙার মতো দেখতে; কিন্তু কামরাঙার চেয়ে বেশি লম্বা ও চিকন, ত্রিকোণযুক্ত। ফল ভাঙলে ভেতরে সাদা কাগজের মতো ডানাবিশিষ্ট বীজ থাকে। রক্তনগাছ নিচু জায়গার আর্দ্র চিরসবুজ বনের কাঠের গাছ। প্রায়ই এ গাছ জলাভূমি ও স্রোতোধারার পাশে দেখা যায়। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত ও ইন্দোচীনে এ গাছ আছে। আইইউসিএন ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, এ প্রজাতির গাছ বাংলাদেশে বর্তমানে সংকটাপন্ন উদ্ভিদ।

প্রকৃতির এ রূপ কোন শিল্পী এঁকেছেন! বিস্ময়ে মাথা নত হয়ে আসে। রক্তন ফুলের এই দর্শন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য একটি অনবদ্য অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।