দিনাজপুরের ছোট যমুনা নদী: অস্তিত্ব সংকটে মরা খালে পরিণত
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ছোট যমুনা নদী আজ মারাত্মক অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একসময়ের প্রাণবন্ত এই জলধারা এখন পানিশূন্য হয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। নদীটির বর্তমান অবস্থা দেখলে বোঝা যায়, এটি কার্যত ময়লা-আবর্জনার একটি ভাগাড়ে রূপান্তরিত হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল জোর দাবি জানাচ্ছে, নদীর অস্তিত্ব রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
পৌর বাজারের ময়লা ফেলায় নদী ভাগাড়ে পরিণত
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ফুলবাড়ী পৌরসভার স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা না থাকায় পৌর বাজারের নিত্যদিনের ময়লা-আবর্জনা সরাসরি ছোট যমুনা নদীতে ফেলা হচ্ছে। বিশেষ করে নদীর ফুটব্রিজের নিচসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিতভাবে এই বর্জ্য নিক্ষেপ করা হয়। এতে নদীটির তলদেশ দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে এবং এর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে ভয়াবহভাবে।
সরেজমিনে পরিদর্শন করলে দেখা যায়, ফুলবাড়ী-দিনাজপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের জোড়া ব্রিজের নিচে এবং পৌর বাজার-সংলগ্ন ফুটব্রিজের পূর্বপ্রান্তে পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা ফেলছেন। এর ফলে নদীর পূর্বপ্রান্ত সম্পূর্ণরূপে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়ে উঠেছে, যা নদীর জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।
অতীতের গৌরবময় দিন থেকে বর্তমানের করুণ অবস্থা
স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশকেও ছোট যমুনা নদী ছিল এই অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র। বর্ষা মৌসুমে নদীটি পানি দিয়ে ভরে উঠত, আর শুষ্ক মৌসুমেও নৌকা চলাচল করত। নৌকা যোগে বিভিন্ন উপজেলার মধ্যে পণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্য সক্রিয় ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীর নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে, পলি জমে অনেক অংশ ভরাট হয়ে গেছে, এবং অবৈধ দখল ও অব্যবস্থাপনার কারণে এর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে।
বর্তমানে নদীটির বিভিন্ন অংশ পানিশূন্য হয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে, যা ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি তীরবর্তী এলাকায় অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় নদীটি দিন দিন আরও সরু হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশবিদরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, ছোট যমুনা নদীকে বাঁচাতে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, অন্যথায় অবহেলা ও দূষণের কারণে এটি একসময় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যেতে পারে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
ফুলবাড়ী সম্মিলিত সচেতন নাগরিক সমাজের সভাপতি হামিদুল হক বলেন, “দ্রুত খনন করে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে এক সময় এই নদীর স্থান হবে শুধু বইয়ের পাতায়।” উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাশেদা আক্তার উল্লেখ করেন, দেশের মিঠাপানির জলাশয়ে প্রায় ২৬০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৬৪ প্রজাতি বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বৃষ্টিপাত হ্রাস, জলাশয় শুকিয়ে যাওয়া এবং পানিদূষণ এর প্রধান কারণ।
ফুলবাড়ী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ও ভারপ্রাপ্ত পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লুৎফুল হুদা চৌধুরী জানান, জাইকা প্রকল্পের মাধ্যমে পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রায় দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ এসেছিল, কিন্তু জমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত জটিলতা এবং প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় বরাদ্দ ফেরত গেছে। তিনি দাবি করেন, নদীতে পৌরসভা থেকে কোনো বর্জ্য ফেলা হচ্ছে না। অন্যদিকে, ফুলবাড়ী পৌর প্রশাসক সামিউল ইসলাম বলেন, নদীতে বর্জ্য ফেলার বিষয়টি তার জানা নেই এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ বলেন, “নদীদূষণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। ছোট যমুনা দূষণরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে ফুলবাড়ী পৌরসভাকে অবহিত করা হবে।”
এই পরিস্থিতিতে ছোট যমুনা নদীর অস্তিত্ব রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছেন স্থানীয়রা ও পরিবেশবিদরা।



