দিনাজপুরের ছোট যমুনা নদী: অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, ময়লা-আবর্জনায় ভাগাড়ে পরিণত
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর ঐতিহাসিক ছোট যমুনা নদী এখন মারাত্মক অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। পানিশূন্য হয়ে নদীটি অনেক জায়গায় মরা খালে পরিণত হয়েছে, আর পৌরসভার ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে নদীর বিভিন্ন অংশ ভাগাড়ে রূপ নিয়েছে। স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের জোরালো দাবি, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই নদীটি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যেতে পারে, যা পুরো অঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি সৃষ্টি করবে।
পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব: নদী ভাগাড়ে পরিণত
স্থানীয় বাসিন্দাদের সরাসরি অভিযোগ, ফুলবাড়ী পৌরসভার স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় পৌর বাজারের নিত্যদিনের ময়লা-আবর্জনা ছোট যমুনা নদীর বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত ফেলা হচ্ছে। বিশেষ করে ফুটব্রিজের নিচে ও আশপাশ এলাকায় আবর্জনার বিশাল স্তূপ জমে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা পরিবেশগত বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সরেজমিনে পরিদর্শন করলে স্পষ্ট দেখা যায়, ফুলবাড়ী-দিনাজপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে পৌর শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীর ওপর বড় ব্রিজ (জোড়া ব্রিজ) এবং পৌর বাজার সংলগ্ন ফুটব্রিজের পূর্বপ্রান্তে নিয়মিতভাবে ময়লা ফেলা হচ্ছে। ফলে নদীর ওই অংশে আবর্জনার স্তূপ জমে তা এখন সম্পূর্ণ ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে, যেখানে দুর্গন্ধে পথচারীদের চলাচল দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা স্মরণ করিয়ে দেন, মাত্র তিন-চার বছর আগেও সীমিত পরিসরে ময়লা ফেলা হলেও বর্তমানে পৌরসভার অধিকাংশ বর্জ্য এখানেই ফেলা হচ্ছে। গৃহস্থালি বর্জ্যের পাশাপাশি কাঁচাবাজারের ময়লাও নিয়মিত নদীতে ফেলা হচ্ছে, যা জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করছে এবং প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত করছে। ফুলবাড়ী সম্মিলিত সচেতন নাগরিক সমাজের সভাপতি হামিদুল হক সতর্ক করে বলেন, ‘নদীটি দ্রুত খননের মাধ্যমে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই নদীর অস্তিত্ব খুঁজে পাবে না, এবং আমরা একটি প্রাকৃতিক সম্পদ চিরতরে হারাবো।’
ঐতিহাসিক প্রাণপ্রবাহ থেকে মরা খাল: সময়ের সঙ্গে অবহেলা
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যমতে, ১৯৮০-এর দশকেও ছোট যমুনা নদী ছিল এই অঞ্চলের প্রাণপ্রবাহ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। বর্ষায় নদীটি ভরে উঠত, শুষ্ক মৌসুমেও নৌকা চলাচল করত, এবং নদীপথে বিভিন্ন এলাকায় পণ্য পরিবহনসহ ব্যবসা-বাণিজ্য সক্রিয়ভাবে চলত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীর নাব্যতা কমে গিয়ে পলি জমে অনেক অংশ ভরাট হয়ে গেছে, পাশাপাশি অবৈধ দখল ও সরকারি-বেসরকারি অব্যবস্থাপনার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পরিবেশবিদরা জোর দিয়ে বলেন, নদী শুধু একটি জলধারা নয়; এটি একটি অঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ছোট যমুনা নদী রক্ষায় পরিকল্পিত ও জরুরি উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রশাসনের বক্তব্য: জটিলতা ও প্রতিশ্রুতি
ফুলবাড়ী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ও ভারপ্রাপ্ত পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লুৎফুল হুদা চৌধুরী ব্যাখ্যা দেন, জাইকা প্রকল্পের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রায় দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও জমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তিনি দাবি করেন, পৌরসভা থেকে সরাসরি নদীতে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে না, তবে সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হবে। অন্যদিকে, ফুলবাড়ী পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সামিউল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই, এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ স্পষ্টভাবে বলেন, ‘নদী দূষণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। ছোট যমুনা নদী রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।’
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাশেদা আক্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যোগ করেন, দেশের মিঠাপানির জলাশয়ে প্রায় ২৬০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৬৪টি বর্তমানে হুমকির মুখে। নদী-নালায় বর্জ্য ফেলার কারণে জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে এবং প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দেন, অন্যথায় দূষণ ও অবহেলার কারণে নদীটি একসময় পুরোপুরি বিলীন হয়ে যেতে পারে, এবং এর প্রভাব পুরো অঞ্চলের পরিবেশ ও অর্থনীতিতে পড়বে।



