ছোট নিমপোখের সন্ধানে: হাজারিখিল অভয়ারণ্যে বিরল পাখির দেখা
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির হাজারিখিল বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যে একটি ছোট নিমপোখ পাখির সন্ধানে সাত বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর সফলতা এসেছে। পাখি পর্যবেক্ষকদের একটি দল রাতের আঁধারে বিশেষ কৌশলে পাখিটির ডাক শুনে ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছেন।
সাত বছরের অপেক্ষা
২০১৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো শায়েস্তাগঞ্জের একটি বাঁশঝাড়ে ছোট নিমপোখ পাখিটিকে দেখা গিয়েছিল, কিন্তু ভালো ছবি তোলা সম্ভব হয়নি। এরপর বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে খোঁজা হলেও পাখিটির দেখা মেলেনি। অবশেষে ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় হাজারিখিল অভয়ারণ্যে কিছুক্ষণের জন্য পাখিটির দেখা মিললেও সেবারও ভালো ছবি তোলা যায়নি।
বার্ডিংবিডি ট্যুরসের অভিযান
এ বছরের ২৫ মার্চ রাতে, পাখি পর্যবেক্ষণের গ্রুপ ‘বার্ডিংবিডি ট্যুরস’-এর আয়োজনে ছয়জনের একটি দল হাজারিখিল অভয়ারণ্যের উদ্দেশে রওনা হয়। ভোরে পৌঁছে সারাদিন বিভিন্ন স্পটে পাখি খুঁজে বেড়ানো হয়। রাতে গেস্টহাউস থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের একটি ছোট টিলার ওপর উঠে মোবাইলে লালচে নিমপোখের ডাক বাজানো হয়।
প্রথমে লালচে নিমপোখ দূর থেকে ডাকের উত্তর দিলেও কাছে আসেনি। পরে শায়েস্তাগঞ্জের বাঁশঝাড়ে দেখা ছোট প্যাঁচাটির ডাক বাজানো হলে, কয়েকবার বাজানোর পর খুব কাছ থেকে পাখিটি উত্তর দেয়। দলের একজন গাছে টর্চের আলো ফেলতেই পাখিটিকে দেখতে পাওয়া যায়। বিরক্ত হওয়ার আগেই দ্রুত প্রয়োজনীয় সংখ্যক ছবি তুলে টর্চ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ছোট নিমপোখের পরিচয়
শায়েস্তাগঞ্জের বাঁশঝাড় ও হাজারিখিলে দেখা পাখিটি বাংলাদেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি ছোট নিমপোখ। এটি কালো দাগওয়ালা নিমপোখ বা ছোট নিমপ্যাঁচা নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে একে কোকিলকণ্ঠী প্যাঁচা বলা হয়। ইংরেজি নাম ওরিয়েন্টাল, নর্থ ইন্ডিয়ান বা ইউরেশিয়া স্কুপ আউল। বৈজ্ঞানিক নাম Otus sunia।
এই পাখির বৈশ্বিক বিস্তৃতি বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান থেকে জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও সাইবেরিয়ার পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত। ছোট নিমপোখ গাঁট্টাগোট্টা পাখি, দেহের দৈর্ঘ্য ১৭-২১ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৭৫-৯৫ গ্রাম। প্যাঁচাটির তিনটি বর্ণরূপ রয়েছে: লালচে, বাদামি ও ধূসর।
বৈশিষ্ট্য ও বাসস্থান
- কানঝুঁটি ও মুখমণ্ডলের গোলকের চারদিকে লালচে রং থাকে।
- গলায় গলাবন্ধ নেই এবং দেহের নিচের পালকে প্রচুর দাগছোপ দেখা যায়।
- চোখের রং হলুদ, চঞ্চু ও পা ধূসরাভ।
- দেশব্যাপী বন-বাগান ও গাছপালাপূর্ণ গ্রামীণ এলাকায় একাকী বা জোড়ায় থাকে।
- দিনে গাছের ছায়াঘেরা ডালে বা বাঁশঝাড়ে লুকিয়ে থাকে, রাতে শিকার খোঁজে।
খাদ্যতালিকায় কীটপতঙ্গ, টিকটিকি, ইঁদুর ও ছোট পাখি অন্তর্ভুক্ত। নমনীয় স্বরে ‘টুক-টুক-কু-রুক—-’ শব্দে তিন–চারবার ডাকে। মার্চ থেকে আগস্ট প্রজননকাল, যখন প্যাঁচা সারা রাত ধরে ডাকতে থাকে।
প্রজনন ও আয়ুষ্কাল
বাসা বানানো হয় গাছের প্রাকৃতিক কোটরে বা কাণ্ডের গর্তে। প্যাঁচী তিন থেকে পাঁচটি সাদা ডিম পাড়ে এবং একাই ডিমে তা দেয়। প্যাঁচা ডিমে তা–দানরত প্যাঁচীকে খাওয়ায়। ডিম ফোটে ২২-২৫ দিনে এবং প্যাঁচা-প্যাঁচী উভয়েই মিলেমিশে ছানাদের লালনপালন করে। আয়ুষ্কাল সাধারণত তিন–চার বছর।
এই সফল অভিযানটি পাখি পর্যবেক্ষকদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন, যা বাংলাদেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।



