সিলেটের শাহ আরেফিন টিলা: প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার গল্প
শাহ আরেফিন টিলা: প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা

সিলেটের শাহ আরেফিন টিলা: প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার গল্প

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরেফিন টিলা একসময় ছিল সবুজে ঘেরা এক অনিন্দ্যসুন্দর প্রাকৃতিক আধার। স্থানীয়ভাবে ‘পাথরের খনি’ হিসেবে পরিচিত এই টিলা আড়াই দশকের ব্যবধানে আজ এক ‘কঙ্কালসার’ ভূমিখণ্ডে পরিণত হয়েছে। জেলা প্রশাসক নিজেই স্বীকার করেছেন, ‘আরেফিন টিলা আর টিলা নাই, সমুদ্র বানিয়ে ফেলা হয়েছে।’ এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক ব্যর্থতার স্বীকারোক্তিই প্রকাশ পায়। এখন সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার, এই টিলার অস্তিত্ব থাকবে কি থাকবে না।

রাজনৈতিক পরিবর্তন ও লুটপাটের ধারাবাহিকতা

গত আড়াই দশকে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, স্থানীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার রদবদল ঘটেছে, কিন্তু এ টিলার ভাগ্য বদলায়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে শুরু করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরবর্তী সময় পর্যন্ত এ টিলায় লুটপাটের উৎসবও থামেনি। বরং নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পাথরখেকো সিন্ডিকেটকে আরও বেশি উৎসাহিত করেছে। যখন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা আর প্রশাসনিক নির্লিপ্ততা এক হয়, তখন প্রকৃতি রক্ষা যে কতটা কঠিন, শাহ আরেফিন টিলা তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

প্রশাসনের কথিত সম্পৃক্ততা ও উদ্বেগজনক তথ্য

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এই লুটপাটে প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার কথিত সম্পৃক্ততা। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, টহলরত পুলিশকে নির্দিষ্ট হারে ‘উৎকোচ’ দিয়ে দিনদুপুরে শত শত ট্রলি পাথর পাচার হচ্ছে। এমনকি ‘ওসির লাইন’ নামক বিশেষ সংকেতে রাতের আঁধারে ট্রাক্টর দিয়ে পাথর সরানোর যে ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে, তা শিউরে ওঠার মতো। যদিও পুলিশ প্রশাসন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো রাস্তায় খুঁটি পোঁতা বা ট্রাক্টর পুড়িয়ে দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপের পরও যখন বিকল্প পথে পাথর লুট থামছে না, তখন বুঝতে হবে এই সিন্ডিকেটের শিকড় অনেক গভীরে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পাথর ব্যবসায়ীদের শক্তি ও রাজনৈতিক আশ্রয়

পাথর ব্যবসায়ীদের এই চক্রটি এতটাই শক্তিশালী যে তারা যৌথ অভিযানের সময় পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের ওপর হামলা চালাতেও দ্বিধাবোধ করে না। এই ধৃষ্টতা তারা পায় রাজনৈতিক আশ্রয় থেকে। প্রতিবেদনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক নেতার নাম উঠে এসেছে, যাঁরা এই কারবারে আড়ালে থেকে মদদ দিচ্ছেন।

সমাধানের পথ ও ভবিষ্যতের হুমকি

আমরা মনে করি, কেবল জেল-জরিমানা বা মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে এই বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব নয়। আরেফিন টিলাকে বাঁচাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। স্থানীয় প্রশাসনকে প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে। যে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে লুটপাটে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে, তদন্তসহকারে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। জেলা প্রশাসকের প্রস্তাব অনুযায়ী সেখানে দ্রুত একটি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা এবং পুরো এলাকাটিকে সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। এই লুটপাটের মহোৎসব এখনই বন্ধ না হলে অদূর ভবিষ্যতে সিলেট অঞ্চল এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে।