গাছপালা কীভাবে বুঝতে পারে বসন্তের আগমন?
শীত শেষে উত্তর গোলার্ধে বসন্তের আগমন ঘটে। এই সময়ে গাছের শুকনা ডালপালায় নতুন পাতা ও ফুল গজাতে শুরু করে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, গাছপালার কাছে কোনো ক্যালেন্ডার বা ঘড়ি না থাকা সত্ত্বেও তারা কীভাবে ঠিক সময়টি বুঝতে পারে? বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, গাছের ভেতরেও মানুষের মতো একধরনের দেহঘড়ি বা সার্কাডিয়ান ক্লক বিদ্যমান।
দেহঘড়ি ও পরিবেশগত সংকেত
এই দেহঘড়ির সাহায্যে উদ্ভিদ দিনের দৈর্ঘ্য এবং তাপমাত্রার পরিবর্তন সূক্ষ্মভাবে মেপে নিতে পারে। বাতাসের তাপমাত্রা ও সূর্যালোকের পরিবর্তন দেখে গাছপালা সহজেই বুঝতে পারে যে শীত বিদায় নিচ্ছে এবং এখন ফুল ফোটার উপযুক্ত সময় হয়েছে। মজার বিষয় হলো, গবেষণায় দেখা গেছে যে মানসিক চাপের মতো অবস্থাও উদ্ভিদ অনুভব করতে সক্ষম।
ফ্লোরিজেন রাসায়নিকের আবিষ্কার
বিজ্ঞানীরা ১৯৩০ সালে প্রথম জানতে পারেন যে গাছপালা দিনের দৈর্ঘ্য বুঝতে পারে। এই তথ্যের ভিত্তিতেই তারা ঠিক করে কখন ফুল ফোটাতে হবে। সেই সময়ের রাশিয়ান বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছিলেন যে গাছের পাতা থেকে একধরনের রহস্যময় পদার্থ কাণ্ডের মাথায় পৌঁছায়। এই পদার্থটিই ফুল ফোটার জন্য কুঁড়ি তৈরিতে সহায়তা করে। তাঁরা এই বিশেষ রাসায়নিকটির নাম দিয়েছিলেন ‘ফ্লোরিজেন’।
পরবর্তীকালে গবেষকেরা ফ্লোরিজেন কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা চালান। এই গবেষণার মাধ্যমে গাছের ঠিক কোন জায়গায় এবং কেন ফুল ফোটে তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। বসন্তে ফুল ফোটে এমন উদ্ভিদের জন্য লম্বা দিন ও উষ্ণ তাপমাত্রা হলো ঋতু পরিবর্তনের প্রধান সংকেত।
বিভিন্ন উদ্ভিদের প্রতিক্রিয়া
যেসব উদ্ভিদে পাতা থাকে, সেগুলো সূর্যালোকের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। মার্চ থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত দিনের আলো বাড়তে থাকে, যা গাছকে ফুল ফোটাতে উৎসাহিত করে। অন্যদিকে, ড্যাফোডিল ও টিউলিপের মতো উদ্ভিদ, যাদের ফুল মাটি থেকে ফোটে, অথবা চেরিগাছের জন্য প্রধান সংকেত হলো ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ তাকাতো ইমাইজুমি জানিয়েছেন, পৃথিবীর উদ্ভিদেরা এভাবেই ঋতুগত পরিবর্তনগুলো অনুভব করে এবং সে অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করে।
বাস্তব উদাহরণ: ক্যালিফোর্নিয়া ও ওয়াশিংটন ডিসি
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেথ ভ্যালি এলাকাটি সাধারণত খুব গরম ও শুকনা থাকে। কিন্তু এ বছর সেখানে অতিরিক্ত বৃষ্টির প্রভাবে পুরো এলাকায় প্রচুর পরিমাণে বুনো ফুল ফুটেছে। যদিও নিচু এলাকাগুলোয় ফুল ফোটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, তবে অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গাগুলোয় এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এসব ফুল দেখা যাবে।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটন ডিসির বিখ্যাত চেরি ব্লসম গাছগুলোয় ২৯ মার্চ থেকে ১ এপ্রিলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফুল ফোটার সম্ভাবনা আছে। ন্যাশনাল মল এলাকার ইয়োশিনো গাছগুলোয় সাধারণত বেশ কয়েক দিন ধরে ফুল ফোটে। তবে এই ফুল কত দিন টিকে থাকবে তা সম্পূর্ণরূপে আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। আকাশ পরিষ্কার ও শান্ত থাকলে ফুল বেশি দিন টিকে থাকে। কিন্তু বৃষ্টি বা দমকা হাওয়া বইলে ফুল দ্রুত ঝরে যেতে পারে। আবার হঠাৎ তুষারপাত হলে ফুল ফোটা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এই প্রক্রিয়াগুলো গাছপালার অভ্যন্তরীণ দেহঘড়ি এবং পরিবেশগত সংকেতের মধ্যে একটি জটিল মিথস্ক্রিয়া নির্দেশ করে, যা তাদেরকে ঋতু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।



