অতি বিরল বৈকাল হাঁসের সন্ধান: বাইক্কা বিলে পাঁচ বছরের খোঁজের পর অবশেষে সফলতা
শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিল জলাভূমি অভয়াশ্রমে একটি অতি বিরল পরিযায়ী হাঁসের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা পাঁচ বছর ধরে খোঁজার পর এক আলোকচিত্রীর ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। এই হাঁসটি স্থানীয়ভাবে মনিরা হাঁস বা বৈকাল হাঁস নামে পরিচিত, এবং এটি বাংলাদেশে খুবই বিরলভাবে দেখা যায়।
দীর্ঘ খোঁজের ইতিহাস
পাঁচ বছর আগে, পক্ষী আলোকচিত্রী ইমরুল কায়েসকে নিয়ে রাজশাহীর পদ্মা নদীর শ্যামপুর চরে এই হাঁসের খোঁজে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু তখন তা পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে, ফেসবুকে অন্য একজন আলোকচিত্রী নূর-ই-সৌদ বিরল হাঁসটির ছবি পোস্ট করলেও, ব্যস্ততার কারণে সঙ্গে সঙ্গে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ১৮ দিন পর আবারও শ্যামপুরে গিয়ে খোঁজা হলেও, হাঁসের ভিড়ে তাকে শনাক্ত করা যায়নি।
এর আগে, টাঙ্গুয়া ও হাকালুকি হাওর, বাইক্কা বিল, হাতিয়া, দমার চরসহ বিভিন্ন স্থানে এই হাঁসের সন্ধান চালানো হয়েছিল। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে টাঙ্গুয়ায় একজন আলোকচিত্রী এর ছবি তুলতে সক্ষম হলেও, অন্যান্যরা ব্যর্থ হয়েছিলেন।
বাইক্কা বিলে শেষ প্রচেষ্টা
গত ২৪ জানুয়ারি অতি বিরল পাতি সারসের ছবি তুলে সিলেট থেকে শ্রীমঙ্গলে যাওয়ার পর, ২৬ জানুয়ারি সকালে বাইক্কা বিল জলাভূমি অভয়াশ্রমে যাওয়া হয়। বর্তমানে বিলটি জনসাধারণের জন্য বন্ধ থাকলেও, সেখানে কিছু হাঁস ও জলচর পাখি দেখা গেছে, যদিও সংখ্যায় সেগুলো নগণ্য।
টাওয়ার থেকে নিচে নেমে করচ বাগানের ভেতর দিয়ে হেঁটে বিলের ধারে গিয়ে প্রায় আধ ঘণ্টা ছবি তোলা হয়। ঢাকা ফেরার তাড়া থাকায় বেশি সময় দেওয়া সম্ভব হয়নি, তাই বিলে দেখা প্রায় সব হাঁসের ছবি তোলা হয়েছিল, যাতে পরে ছবি দেখে শনাক্ত করা যায়।
অজান্তে সফলতা
রাতে বাসায় ফিরে ক্যামেরা থেকে ছবি ল্যাপটপে নিয়ে প্রতিটি ছবি পরীক্ষা করা শুরু হয়। ৯, ১০ ও ১১ নম্বর ছবিতে উড়ন্ত পিয়ং হাঁসের ঝাঁকের পেছনে অধরা হাঁসাটি উড়তে দেখা যায়, যা দেখে মন আনন্দে ভরে ওঠে। পরবর্তীতে ১৩৭-১৩৯ নম্বর ক্লিকে পানিতে ভাসমান পাখিটির ছবিও পাওয়া যায়। আশ্চর্যের বিষয়, ছবি তোলার সময় এত হাঁসের ভিড়ে তাকে খেয়ালই করা হয়নি, কিন্তু দূর থেকে স্পষ্ট ছবি পাওয়া গেছে।
বিরল পাখির পরিচয়
অনেক খোঁজার পর অজান্তে পাওয়া এই হাঁসটি বাংলাদেশের বিরল ও তথ্য অপ্রতুল ভবঘুরে পাখি মনিরা হাঁস, যাকে অনেকে বৈকাল হাঁসও বলেন। এর ইংরেজি নাম বৈকাল/বিমাকুলেট/স্কোয়াক ডাক বা ফরমোজা টিল। অ্যানাটিডি গোত্রের এই হাঁসের বৈজ্ঞানিক নাম Sibirionetta formosa, যার অর্থ সুন্দর হাঁস।
পূর্ব রাশিয়ার আবাসিক এই হাঁসটি শীতে সাধারণত পূর্ব এশিয়ায় পরিযায়ন করে। এটি ছোট আকারের হাঁস, দেহের দৈর্ঘ্য ৩৯-৪৩ সেন্টিমিটার। হাঁসা ও হাঁসির ওজন যথাক্রমে ৩৬০-৫২০ ও ৪০২-৫০৫ গ্রাম। প্রজননকালে হাঁসার মাথা ও মুখমণ্ডল নকশাদার হয়ে ওঠে, যেখানে মাথার চাঁদি, ঘাড়, ঘাড়ের পেছন ও গলা কালো রঙের হয়।
বাংলাদেশে উপস্থিতি ও অভ্যাস
শীতে এই হাঁস কালে-ভদ্রে সিলেটের হাওর-বিল ও রাজশাহীর পদ্মা নদীতে দেখা যায়, এবং একসময় ঢাকায়ও দেখা যেত। এরা সাধারণত একাকী, জোড়ায় বা হাঁসের মিশ্র ঝাঁকে বিচরণ করে। পানিতে মাথা ডুবিয়ে জলজ উদ্ভিদের পাতা, মূল ও বীজ, জলজ কীটপতঙ্গ, কেঁচো, শামুক-গুগলি ইত্যাদি খায়।
প্রজননকাল মে থেকে জুন মাসে হয়, যখন এরা সাইবেরিয়ার পানির ধারে তৃণভূমিতে বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ৬-৯টি, এবং সবুজাভ-ধূসর রঙের ডিমগুলো ২৪-২৫ দিনে ফোটে। ছানারা ২৫-৪০ দিনে উড়তে শেখে এবং এদের আয়ুষ্কাল সাধারণত ৬-৭ বছর।
আ ন ম আমিনুর রহমান: পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।



