নরসিংদীর নদী দূষণ: জীবনের উৎস থেকে মৃত্যুর প্রবাহে পরিণত
বাংলার ভূগোল নদীনির্ভর হলেও আজ দেশের বহু নদীই জীবনের উৎস থেকে মৃত্যুর উৎসে পরিণত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ইত্তেফাকে নরসিংদীর নদীগুলি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন নদীদূষণের হিমবাহের উপরিভাগের চিত্র মাত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নরসিংদীর মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, আড়িয়াল খাঁ, হাঁড়িধোয়া কিংবা ব্রহ্মপুত্র—যেসব নদনদী একদা জীবন, বাণিজ্য ও জীবিকার প্রাণস্পন্দন ছিল, আজ সেগুলিই বিষাক্ত প্রবাহে পরিণত হয়েছে। এই নদীগুলি এখন জনজীবন ও পরিবেশের জন্য এক নীরব বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠেছে।
সমগ্র বাংলাদেশের উদ্বেগজনক প্রতিচ্ছবি
বলার অপেক্ষা রাখে না, এই চিত্র কেবল নরসিংদীতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের নদীব্যবস্থার এক উদ্বেগজনক প্রতিচ্ছবি। একসময় এই নদীপথেই বৃহৎ জাহাজ চলত, পালতোলা নৌকায় ব্যবসায়ীরা আসতেন, নদীতীর ছিল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। কিন্তু শিল্পায়নের অব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ এবং পরিবেশগত শৃঙ্খলার অভাবে আজ সেই নদীগুলি সংকুচিত, দূষিত ও প্রাণহীন।
প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে, কলকারখানার বিষাক্ত কেমিক্যাল সরাসরি পাইপযোগে নদীতে নিঃসৃত হচ্ছে। ফলে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা এতটাই হ্রাস পেয়েছে যে, জলজপ্রাণী বাঁচার ন্যূনতম পরিবেশটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। গবেষণায় হাঁড়িধোয়া নদীতে অক্সিজেনের পরিমাণ মাত্র শূন্য দশমিক ছয়—যা প্রকৃতপক্ষে এক মৃতপ্রায় নদীর পরিচায়ক। এটি কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, এটি মানবস্বাস্থ্যের প্রতিও সরাসরি হুমকি।
জাতীয় সংকটের অংশমাত্র
এই একই দৃশ্য দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন নদীগুলিতেও প্রতিনিয়ত প্রতিফলিত হচ্ছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু কিংবা কর্ণফুলী—প্রায় সর্বত্রই শিল্পবর্জ্য, ট্যানারি বর্জ্য, রং ও রাসায়নিক পদার্থের নির্বিচার নিঃসারণ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রাণশক্তিকে নিঃশেষ করছে। কোথাও পানি কালো, কোথাও তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত, আবার কোথাও নদীর তলদেশ পর্যন্ত মৃতপ্রায়। অর্থাৎ নরসিংদীর নদীগুলি যা ভোগ করছে, তা আসলে একটি বৃহত্তর জাতীয় সংকটের অংশমাত্র।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—উন্নয়ন কি কেবল শিল্পকারখানার সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি তার সাথে পরিবেশগত ভারসাম্যও সমানভাবে রক্ষিত হওয়া উচিত? যে উন্নয়ন নদীকে হত্যা করে, যে অগ্রগতি মানুষের পানিকে বিষাক্ত করে তোলে, তা প্রকৃতপক্ষে উন্নয়ন নয়—তা এক প্রকার আত্মঘাতী প্রবণতা। কারণ নদী ধ্বংস মানেই কৃষি, মৎস্য, জনস্বাস্থ্য ও বাস্তুতন্ত্রের উপর সম্মিলিত আঘাত। শীতলক্ষ্যা নদীর সাম্প্রতিক অবস্থাও একই সতর্কবার্তা প্রদান করছে।
আইনের প্রয়োগের অভাবই প্রধান সমস্যা
এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান—আইন ও নীতিমালার অভাব নয়, বরং তার যথাযথ প্রয়োগের অভাবই প্রধান সমস্যা। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, নদী রক্ষা কমিশন, পরিবেশ অধিদপ্তর—সকলই বিদ্যমান; কিন্তু কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাবে দূষণকারীরা প্রায়শই দায়মুক্তি পেয়ে যায়। নদীকে বর্জ্য নিষ্কাশনের সহজ মাধ্যম বলে বিবেচনা করা যেন এক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে হাঁড়িধোয়া নদীর দূষণ রোধে অর্থ বরাদ্দের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক; কিন্তু কেবল বরাদ্দ প্রদানই সমাধান নয়—প্রয়োজন স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয়। এক বছর অতিবাহিত হলেও যদি বরাদ্দকৃত অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার না হয়, তাহলে তা সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে প্রশাসনিক জটিলতার আরেকটি উদাহরণে পরিণত হয়।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলির সামাজিক দায়বদ্ধতা
এই ক্ষেত্রে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার, বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন ও কার্যকর রাখা—এটি কেবল আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতা। উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে একটি সুসমন্বিত সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রকৃতির বিনাশের বিনিময়ে অর্জিত হবে না।
সর্বোপরি, নদীকে কেবল ভৌগোলিক সত্তা হিসেবে নয়, বরং একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে—এই সত্যটি যতদিন আমাদের নীতি, পরিকল্পনা ও আচরণে প্রতিফলিত না হবে, ততদিন এই সংকটের অবসান ঘটবে না। নরসিংদীর নদীগুলি আজ যে আর্তনাদ করছে, তা কেবল একটি অঞ্চলের আর্তনাদ নয়—এটি সমগ্র বাংলাদেশের নদীগুলিরই সম্মিলিত আর্তনাদ।



