বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিপিসিএলের এআই ও আরবিইউ মডেলের যুগান্তকারী প্রয়োগ
বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এআই ও আরবিইউ মডেল

বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিপিসিএলের এআই ও আরবিইউ মডেলের যুগান্তকারী প্রয়োগ

বাংলাদেশের প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার খাতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ পেট্রোকেমিকেল কোম্পানি লিমিটেড (বিপিসিএল)। সংস্থাটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ও রিসাইক্লিং বিজনেস ইউনিট (আরবিইউ) মডেলের সমন্বয়ে একটি উদ্ভাবনী পদ্ধতি চালু করেছে, যা দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সাতটি আরবিইউ প্রতিষ্ঠা

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্লিজ প্রকল্পের আওতায় বিপিসিএল ফেনী, কক্সবাজার, রূপগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ, বগুড়া, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় সাতটি রিসাইক্লিং বিজনেস ইউনিট (আরবিইউ) প্রতিষ্ঠা করেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ইতিমধ্যে ৬১৭ মেট্রিক টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং ৫ হাজার ৬১৫ জনের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে।

গুলশানে আন্তর্জাতিক ওয়ার্কশপে আলোচনা

সোমবার (৩০ মার্চ) বিকাল ৫টায় রাজধানীর গুলশানের রেনেসাঁ হোটেলে ‘ডিকার্বনাইজিং বাংলাদেশ’স প্লাস্টিক ওয়েস্ট: ইনোভেটিভ সলিউশনস ফর দ্য সার্কুলার ইকোনমি’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বিপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খাদেম মাহমুদ ইউসুফ প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরে একটি বিশদ উপস্থাপনা প্রদান করেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ওয়ার্কশপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, “শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে প্লাস্টিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্লাস্টিক আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বরং পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে। আগামীতে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে আমরা বদ্ধপরিকর।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি ও মতামত

অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন:

  • পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম
  • জাতিসংঘ প্রকল্প সেবা কার্যালয় (ইউএনওপিএস), বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার সুধীর মুরালিধরন
  • ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান জামান চৌধুরী

ড. ফাহমিদা খানম বিপিসিএলের এই কার্যক্রমে সরকারের পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বলেন, “সরকার এ ব্যাপারে সবরকম কারিগরি সহায়তা করতে প্রস্তুত। বিশেষ করে সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টে সরকারের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে।”

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রশংসা ও সমর্থন

ওয়ার্কশপে সুইডেন এম্ব্যাসি, হাঙ্গেরি এম্ব্যাসি, ইউনিসেফ, আইএলও, ইউএনডিপি, ইউএনওপিএস, আইএফসি, এডিবি, কোর্ডএইড, আইইউসিএন ও প্র্যাক্টিকাল অ্যাকশনের প্রতিনিধি, পরিবেশ অধিদপ্তর, কোকা-কোলা, ট্রান্সকম, লাফার্জ-হোলসিম, আরলা-সহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।

জাতিসংঘ প্রকল্প সেবা কার্যালয়ের কান্ট্রি ম্যানেজার সুধীর মুরালিধরন বিপিসিএলের প্রকল্পের উদ্ভাবনকে “উজ্জ্বলতম” আখ্যা দিয়ে বলেন, “প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বস্ততার সঙ্গে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রকল্প সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত।”

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব

এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভাঙারি সরবরাহকারীদের কেজিপ্রতি নিট মুনাফা ২ টাকা থেকে বেড়ে ৩ টাকায় উন্নীত হয়েছে। বিপিসিএলের অংশীদার প্রতিষ্ঠান সিদীপের সহায়তায় ১ হাজার ৪০৪ জন অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রাহককে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, ৭০ জন শিশুকে শিশু যত্নকেন্দ্র সুবিধা এবং ১ হাজার ৪৭৫ জনকে জীবনদক্ষতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ'র প্রফেসর ড. মেলিতা মেহজাবিন তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, “পুরো এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ একটি সুগঠিত ফাইন্যানশিয়াল মডেলের আওতায় আনতে পারলে সবচেয়ে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। প্রতিষ্ঠানটির টেকসই ক্রেতা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষভাবে প্রশংসনীয়।”

সুইডেন অ্যাম্বাসির ফার্স্ট সেক্রেটারি নায়োকা মার্টিনেজ ব্যাকস্টর্ম বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিপিসিএলের কার্যক্রমকে যথেষ্ট প্রশিক্ষিত বলে উল্লেখ করে বলেন, “ব্যক্তি পর্যায় থেকে যে সাপ্লাই চেইন তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি, তা অনেক কঠিন একটি কাজ এবং তারা এই কাজকে সহজ করে ফেলেছে।”

জিআইজেড-এর হেড অব প্রজেক্ট মাইকেল ক্লোড বিপিসিএলের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইকোসিস্টেমে সরকারের অংশগ্রহণ জরুরি। পিইটি পরিবেশবান্ধব ডেলিভারি অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ কার্যকর।”

বিপিসিএলের এই যুগান্তকারী উদ্যোগ বাংলাদেশের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নের দিকে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।