নরসিংদীর নদীগুলো বিষাক্ত দূষণে অস্তিত্ব সংকটে, হুমকিতে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ
নরসিংদীর নদী দূষণে অস্তিত্ব সংকট, হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

নরসিংদীর নদীগুলো বিষাক্ত দূষণে অস্তিত্ব সংকটে

মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদীবেষ্টিত নরসিংদী জেলার প্রাণকেন্দ্র হলো এর শাখা নদীগুলো। ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ, হাঁড়িধোয়া, পাহাড়িয়া এবং পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদী এই অঞ্চলের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তবে বর্তমানে এসব নদনদী কলকারখানার বিষাক্ত কেমিক্যালের দূষণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা তাদের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলেছে।

শিল্পায়নের বিপরীত প্রভাব

একসময় এসব নদী দিয়ে বড় বড় জাহাজ ও পালতোলা নৌকা চলাচল করত, ব্যবসায়ীরা এ পথেই বাণিজ্যে সমৃদ্ধি অর্জন করতেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে নদীতীরে গড়ে উঠা বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহকে সংকুচিত করেছে। এখন বছরের বেশিরভাগ সময় নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় নৌকা চলাচলও বন্ধ হয়ে গেছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো কলকারখানার বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত বর্জ্য পাইপের মাধ্যমে সরাসরি নদীতে পড়ছে। এই দূষণের ফলে বর্ষা মৌসুমেও পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, যার কারণে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী বেঁচে থাকতে পারছে না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হাঁড়িধোয়া নদী: দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দূষিত

‘রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টার’-এর গবেষণা অনুযায়ী, নরসিংদীর ৩৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের হাঁড়িধোয়া নদী দেশের সবচেয়ে দূষিত নদীর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। এই নদীর পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ মাত্র শূন্য দশমিক ৬ এবং ক্ষারতার পরিমাণ চার দশমিক এক, যা জলজ জীবনের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযোগী।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হাঁড়িধোয়া নদীর পানিতে নামলেই খোসপাচড়া, চর্মরোগসহ নানা মারাত্মক রোগ দেখা দিচ্ছে। এমনকি পশুপাখির জন্যও এই পানি ব্যবহার করা যায় না। বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে নদীটি এখন এলাকাবাসীর জন্য অভিশাপে পরিণত হয়েছে, যেখানে আগে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শীতলক্ষ্যা নদীতেও ছড়াচ্ছে দূষণ

হাঁড়িধোয়ার পর এবার খরস্রোতা শীতলক্ষ্যা নদীও দূষণের শিকার হচ্ছে। এই নদীতে এক সময় বোয়াল, রুই, কাতলা, চিতল, পাঙ্গাশ, কাঁচকিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে শীত মৌসুমে কাপাসিয়া থেকে ঘোড়াশাল পর্যন্ত নদীর সব মাছ মরে ভেসে উঠছে, যা পরিবেশগত বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

স্থানীয়দের দাবি ও প্রশাসনের ভূমিকা

নদীর দুই তীরের মানুষ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো জোরালোভাবে দাবি জানাচ্ছেন যে, কলকারখানার দূষিত কেমিক্যাল মিশ্রিত বর্জ্য নদীতে ফেলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। নরসিংদী পরিবেশ আন্দোলন (আপন)-এর সাধারণ সম্পাদক প্রলয় জামান সতর্ক করে বলেন, “প্রতি বছর এভাবে নদী দূষণ হতে থাকলে ও মাছ মারা গেলে এক সময় পরিবেশ হুমকির সম্মুখীন হবে, এমনকি দেশে মাছের আকাল দেখা দিতে পারে।”

জানা গেছে, হাঁড়িধোয়া নদীর দূষণ রোধে গত অন্তর্বর্তী সরকার পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দশ কোটি টাকার একটি বরাদ্দ দিয়েছেন, যা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দেওয়া হয়েছে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের নরসিংদী জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. বদরুল হুদা জানান, এই বরাদ্দ থেকে তাদের অংশ এখনো পাওয়া যায়নি। তিনি আরো উল্লেখ করেন, নদী দূষণের কারণ ও মাছ মারা যাওয়ার বিষয়ে সঠিক তথ্য বের করে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ চলছে।

ভবিষ্যতের জন্য আহ্বান

নদীগুলোর জলজপ্রাণী ও ইকোসিস্টেম রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ভূমিকা পালন করতে হবে বলে মনে করেন স্থানীয় সচেতন মহল। নদীদূষণ রোধে কারখানার মালিক, প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ—সবার সমন্বিত উদ্যোগই পারে নরসিংদীর এই ঐতিহ্যবাহী নদীগুলোকে বাঁচাতে। অন্যথায়, শুধু নদীর অস্তিত্বই নয়, গোটা অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।