এম্পেরর পেঙ্গুইন বিলুপ্তির চরম ঝুঁকিতে: সমুদ্রের বরফ গলে যাওয়ায় বিপর্যয়কর পরিস্থিতি
অ্যান্টার্কটিকার সবচেয়ে পরিচিত প্রাণী এম্পেরর পেঙ্গুইন এখন বিলুপ্তির চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, সমুদ্রের বরফ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় এম্পেরর পেঙ্গুইনগুলো ছোট ও ঘিঞ্জি স্থানে গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই পরিস্থিতি প্রজাতিটির জন্য বিপর্যয়কর পরিণতির ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে।
বিজ্ঞানীদের সতর্কতা ও গবেষণার ফলাফল
ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের প্রধান গবেষক পিটার ফ্রেটওয়েল সতর্ক করে বলেছেন, সমুদ্রের বরফ গলে যাওয়ার এই ধারা অব্যাহত থাকলে এম্পেরর পেঙ্গুইনের বিলুপ্তির সময়সীমা কয়েক দশক এগিয়ে আসবে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অ্যান্টার্কটিকার সমুদ্রের বরফ রেকর্ড পরিমাণ কমেছে। এই অঞ্চলের গড় পাঁচ লাখ বর্গকিলোমিটার বরফের আস্তরণ কমে মাত্র এক লাখ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে। এর ফলে বিশ্বের ৪০ শতাংশ এম্পেরর পেঙ্গুইনকে মাত্র দুই হাজার বর্গকিলোমিটার উপকূলীয় বরফের ওপর আশ্রয় নিতে হচ্ছে।
মোল্টিং প্রক্রিয়া ও এর প্রভাব
এম্পেরর পেঙ্গুইনরা প্রতিবছর তাদের পুরোনো পালক ঝরিয়ে নতুন পানিরোধী পালক গজানোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, যা মোল্টিং নামে পরিচিত। এই তিন থেকে চার সপ্তাহ তারা সাগরের পানিতে নামতে পারে না, কারণ পালক ছাড়া তাদের শরীর জলরোধী থাকে না এবং তারা তীব্র ঠান্ডায় জমে মারা যেতে পারে। মোল্টিংয়ের সময় তারা কোনো খাবারও খেতে পারে না, তাই এই প্রক্রিয়ার আগে তারা নিজেদের শরীরের ওজন ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে নেয়।
স্যাটেলাইট ইমেজে প্রথমবারের মতো মারি বার্ড ল্যান্ডের উপকূলে পেঙ্গুইনদের এই মোল্টিং কলোনি বা আস্তানাগুলো ধরা পড়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সালের আগে মারি বার্ড ল্যান্ডের উপকূলে মোল্টিং পেঙ্গুইনদের শতাধিক দল শনাক্ত করা হয়েছিল, কিন্তু ২০২২ সালের পর সেই সংখ্যা কমে মাত্র ২৫-এ দাঁড়িয়েছে। সমুদ্রের বরফ কমে যাওয়ায় হাজার হাজার পেঙ্গুইন এখন খুব ছোট ছোট বরফখণ্ডে গাদাগাদি করে অবস্থান করছে।
বিপুলসংখ্যক পেঙ্গুইনের মৃত্যুর আশঙ্কা
বিজ্ঞানী ফ্রেটওয়েল আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সম্ভবত বিপুলসংখ্যক পেঙ্গুইন নতুন জলরোধী পালক গজানোর আগেই সাগরের পানিতে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে। যদি এমনটি ঘটে থাকে, তবে এম্পেরর পেঙ্গুইনদের অবস্থা আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সংকটাপন্ন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এম্পেরর পেঙ্গুইনরা খুব ধীরগতিতে বংশবিস্তার করে। তারা ২০ বছর পর্যন্ত বাঁচলেও তিন থেকে ছয় বছর বয়সের আগে প্রজনন শুরু করে না, ফলে একবার বড় কোনো বিপর্যয় ঘটলে পেঙ্গুইনের সেই প্রজননসংখ্যা কাটিয়ে ওঠা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ
গবেষকেরা বলছেন, পরিস্থিতির চাপে পড়ে পেঙ্গুইনরা হয়তো নতুন কোনো নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে যাবে। তবে অ্যান্টার্কটিকায় স্থিতিশীল বরফের চাদর এখন বিরল হয়ে উঠছে, যা তাদের জন্য এক বড় ধরনের ঝুঁকি। এই পরিবেশগত পরিবর্তন শুধু এম্পেরর পেঙ্গুইনের জন্যই নয়, পুরো অ্যান্টার্কটিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে। বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে জরুরি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছেন, যাতে এই অনন্য প্রজাতি এবং তার আবাসস্থল রক্ষা করা যায়।
