ঢাকার আকাশে হঠাৎ অন্ধকার: আবহাওয়াবিদরা বলছেন 'ধোঁয়াশা', দূষণও ভূমিকা রাখছে
ঢাকার আকাশে হঠাৎ অন্ধকার: ধোঁয়াশা ও দূষণের প্রভাব

ঢাকার আকাশে হঠাৎ অন্ধকার: আবহাওয়াবিদরা বলছেন 'ধোঁয়াশা', দূষণও ভূমিকা রাখছে

ছুটির দিন আজ শুক্রবারে সকালের আকাশ বেশ ঝকঝকে ও পরিষ্কার ছিল, কিন্তু বেলা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ঢাকার আকাশ হঠাৎ করেই অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি নগরীর বিভিন্ন স্থানে লক্ষ্য করা যায়, যা নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, এটি কি বায়ুদূষণের ফল, না সাগরে সৃষ্টি হওয়া কোনো লঘুচাপের প্রভাব? এবারই কি প্রথম এমন ঘটনা ঘটছে? আবহাওয়াবিদ ও দূষণ বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেব্রুয়ারির শেষ এবং মার্চের শুরুতে আকাশ হঠাৎ এভাবে মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যায়, যা একটি স্বাভাবিক আবহাওয়াগত ঘটনা।

ধোঁয়াশা কী এবং কেন হয়?

আবহাওয়াবিদরা এই পরিস্থিতিকে 'ধোঁয়াশা' বলে বর্ণনা করেন। মনে হয় যেন চারদিক অন্ধকার করে এসেছে, এই বুঝি মেঘ হয়ে বৃষ্টি নামবে, কিন্তু শেষতক বৃষ্টি হয় না এবং কিছু সময় পর আকাশ আবার পরিষ্কার হয়ে যায়। এই ধোঁয়াশা সৃষ্টির পেছনে নগরীর দূষণ, হাওয়ার বদল, বাতাসে জলীয় বাষ্পের উপস্থিতি এবং সাগরের লঘুচাপের সীমিত প্রভাব—এসব কারণ জড়িত। আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক ব্যাখ্যা করেন যে, প্রকৃতিতে বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তন হচ্ছে, এক প্রবাহের সঙ্গে অন্য প্রবাহের সংঘাত ঘটছে, যা বায়ুকে এলোমেলো আচরণ করতে বাধ্য করে। এর সঙ্গে রাতের কমতে থাকা তাপমাত্রা এবং দূষণ মিলে শেষ বিকেল ও সকালে সূর্য ওঠার পর আকাশ মেঘলা মনে হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, শেষ ফেব্রুয়ারি এবং মার্চের শুরু পর্যন্ত এমনটা থাকাই স্বাভাবিক, এবং বৃষ্টি না হলে এ পরিস্থিতি চলতে থাকবে।

বায়ুদূষণের ভয়াবহতা: ঢাকা বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে

রাজধানী ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের দূষিত নগরীগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। আজ শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের বায়ুদূষণ সূচক অনুযায়ী, বিশ্বের ১২৩টি নগরীর মধ্যে ঢাকা দ্বিতীয় স্থানে ছিল, যেখানে বায়ুর মান ২৮৪ রেকর্ড করা হয়েছে। এই সূচকটি বাতাসের মান নিয়ে তৈরি করা একটি তাৎক্ষণিক সূচক, যা একটি নির্দিষ্ট শহরের বাতাস কতটা নির্মল বা দূষিত, সে সম্পর্কে তথ্য দেয় ও মানুষকে সতর্ক করে। বায়ুদূষণের মাত্রা ২০০-এর বেশি হলে সেটিকে 'খুব অস্বাস্থ্যকর' এবং ৩০০ হয়ে গেলে 'দুর্যোগপূর্ণ' বলে বিবেচনা করা হয়।

দূষণের উৎস ও আন্তমহাদেশীয় প্রভাব

নগরীর এই দূষণের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে ইটভাটা ও কলকারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের কালো ধোঁয়া ইত্যাদি। তবে শুধু স্থানীয় উৎসই নয়, আন্তমহাদেশীয় দূষিত বায়ুপ্রবাহও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই দূষিত বায়ু ভারতের দিল্লি, পাকিস্তানের লাহোর ও করাচি এবং ভারতের বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে, যা একটি দূষিত স্তর সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় এই দূষিত স্তর আপাতত স্থায়ী হয়ে গেছে, ফলে গত জানুয়ারি মাস এবং চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় প্রতিদিন বায়ুদূষণে বিশ্বের নগরীগুলোর মধ্যে একেবারে সামনের সারিতে থেকেছে ঢাকা।

বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তন ও ভবিষ্যত সম্ভাবনা

এখন প্রকৃতিতে শীতের বিদায় হয়ে বসন্ত এসেছে, এবং তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছে। শীতকালে উত্তর-পশ্চিম বায়ু প্রবাহিত হয়, আর গরমে আসে দক্ষিণের বায়ু। এই পরিবর্তনশীল বায়ুপ্রবাহ ধোঁয়াশা সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তবে আশার কথা হলো, সাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা আগামী সোমবার অথবা মঙ্গলবার বরিশাল, খুলনা বা চট্টগ্রাম বিভাগের কোনো কোনো স্থানে বৃষ্টি নিয়ে আসতে পারে। আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুকের মতে, মূলত উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে, এবং এতে এই ধোঁয়াশা কাটতে পারে, যা দূষণ কমাতেও ভূমিকা রাখবে।

সামগ্রিকভাবে, ঢাকার আকাশে হঠাৎ অন্ধকার হওয়া একটি আবহাওয়াগত ও পরিবেশগত ঘটনা, যা ধোঁয়াশা নামে পরিচিত এবং দূষণের সঙ্গে জড়িত। নাগরিকদের সচেতনতা ও যথাযথ পদক্ষেপ এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।