বিশ্বের শীর্ষ দূষিত নগরীতে পরিণত হয়েছে ঢাকা
ভারতের রাজধানী দিল্লি ও পাকিস্তানের নগরী লাহোরকে পেছনে ফেলে আজ বৃহস্পতিবার সকালে বিশ্বের শীর্ষ দূষিত নগরীর তালিকায় প্রথম স্থান দখল করেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। সাধারণত দূষণের দিক থেকে শীর্ষে থাকা এই দুই শহরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘটনাটি পরিবেশগত সংকটের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে একটি দিনও নির্মল বায়ু পায়নি ঢাকাবাসী, যা শহরের বায়ুদূষণের ভয়াবহতা তুলে ধরছে।
বায়ুর মান ২৯১, 'খুব অস্বাস্থ্যকর' অবস্থা
আজ সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিশ্বের ১২১টি শহরের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ঢাকার বায়ুর মান ২৯১ পয়েন্টে পৌঁছেছে। এই মানকে 'খুব অস্বাস্থ্যকর' হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার নিয়মিতভাবে বায়ুদূষণের এই তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করে থাকে। তাদের তৈরি লাইভ সূচকটি নির্দিষ্ট শহরের বাতাস কতটা নির্মল বা দূষিত, সে সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য প্রদান করে এবং জনগণকে সতর্ক করে।
ঢাকার চার স্থানে অস্বাভাবিক খারাপ বায়ুর মান
ঢাকা শহরের চারটি স্থানে আজ বায়ুর মান অস্বাভাবিকভাবে খারাপ রেকর্ড করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়নি এমন মাত্রার দূষণ নির্দেশ করছে। বিশেষ করে, নিকুঞ্জের এএসএল সিস্টেমস লিমিটেডসংলগ্ন এলাকায় বায়ুর মান ৫৪১ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে। বায়ুদূষণের মাত্রা ২০০-এর বেশি হলে সেটিকে 'খুব অস্বাস্থ্যকর' এবং ৩০০ হয়ে গেলে 'দুর্যোগপূর্ণ' বলে বিবেচনা করা হয়। নিকুঞ্জের এই মান তাই অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়ের।
অন্যান্য তিনটি স্থানের বায়ুর মানও উদ্বেগজনক:
- দক্ষিণ পল্লবী: ৪২২ পয়েন্ট
- বেচারাম দেউড়ি: ৪০০ পয়েন্ট
- ধানমন্ডি: ৩৮০ পয়েন্ট
বায়ুদূষণের ভয়াবহ পরিণতি ও সরকারি উদ্যোগের অভাব
বায়ুদূষণ ঢাকায় ভয়াবহভাবে বাড়ছে, যার প্রভাব দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর পড়ছে। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণে প্রায় দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ক্ষতি প্রায় ৮ শতাংশ হয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সরকারের সময় নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেসবে কার্যকর ফলাফল দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া পদক্ষেপগুলোরও তেমন কোনো ইতিবাচক ফল নেই, এবং ঢাকা বা দেশের অন্য কোনো স্থানে দূষণ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
দেশব্যাপী দূষণ বৃদ্ধি ও এলাকাভিত্তিক পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন
দেশের সর্বত্রই বায়ুদূষণ বাড়ছে, তবে কিছু ক্ষেত্রে আজকাল ঢাকার বাইরের অন্যান্য এলাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা অনেক বেশি থাকছে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে যেসব কার্যক্রম আছে, তা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক, কিন্তু এসব কার্যক্রমের তেমন কোনো ফল নেই বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়নকেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, 'রাজধানীর যেসব এলাকায় অতিরিক্ত দূষণ, সেসব এলাকাভিত্তিক দূষণ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশনের তেমন উদ্যোগ নেই। দেখা যাবে, হয়তো এসব এলাকায় নির্মাণ বা কোনো কারখানার দূষণ আছে। এখন এই এলাকাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ জরুরি।'
নতুন সরকার দূষণ রোধে কী করতে পারে, তা এখন একটি বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে। বায়ুদূষণ কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি গভীর সংকট তৈরি করছে।
